আমাদের ধনী আর তাহাদের ধনী

কামরম্নল হাসান বাদল
Kamrul Hassan Badal

১. বিল গেটস নামে যদি কোনো দেশ থাকত তবে সে দেশটি বিশ্বের ৩৭তম ধনী দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেত। কিন’ বিল গেটস কোনো দেশের নাম নয়। একজন ব্যক্তির নাম। যিনি বিশ্বের সেরা ধনীদের মধ্যে সেরা। তিনি যে সম্পত্তির মালিক তা বসে বসে খেলেও তা ফুরাতে লাগবে ২১৮ বছর। তবে সে বসে বসে খাওয়া কিন’ কিপ্টার মতো নয়, প্রতিদিন ১০ লাখ মার্কিন ডলার খরচ করলে তবে। বর্তমান তাঁর সঞ্চিত ধনসম্পদের মূল্য ৮৪.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বিল গেটস ঠিক করেছেন তাঁর বিশাল অর্থ সম্পদ দাতব্য প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে যাবেন। তাঁর তিন ছেলেমেয়ে। দুই মেয়ে জেনিফার ক্যাথরিন ও ফোয়েবি অ্যাজ্যালে। আর একমাত্র ছেলের নাম রোরি জন। বিল গেটসের বিপুল বিশাল সম্পত্তি থেকে তিন সনত্মান পাচ্ছেন এক কোটি ডলার করে মাত্র তিন কোটি ডলার। বিল এবং তাঁর স্ত্রী মেলিন্ডা গেটস মনে করেন, সনত্মানদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে বিপুল ধনসম্পদ রেখে যাওয়ার কোনো মানে নেই। বরং এটি সনত্মানের জন্য উপকারী নাও হতে পারে। এই দম্পতির দাবি ধনসম্পদ নিজের মতো করে পথচলায় বাধা সৃষ্টি করে। এই দম্পতির বড় মেয়ে জেনিফার ক্যালিফোর্নিয়ার স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। ছেলে রোরি ও ছোট মেয়ে ফোয়েবি এখনো স্কুলে পড়ছে। তারা সিয়াটলে বাবা-মায়ের সাথে থাকে। গেটসের সম্পদ দাতব্য কাজে দানের এই সিদ্ধানত্মকে স্বাগত জানিয়েছে তিন সনত্মান। বিশ্বব্যাপী মানুষকে বিভিন্ন সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য দাতব্য সংস’া হিসেবে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন এখন আলোচিত একটি নাম। বিল গেটস শুধু নিজেই যে সম্পদ দান করেছেন তা কিন’ নয়। তিনি অন্যদেরও তা করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। বছর দুয়েক আগে তাঁর আহবানে সাড়া দিয়ে চীনের অনত্মত ১০০ ধনকুবের তাদের সম্পদ দাতব্যকাজে দান করে দিয়েছেন।
ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জুকারবার্গ মাত্র ২৩ বছর বয়সে বিলিয়নিয়ার হন। এটি ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সে বিলিয়নিয়ার হওয়ার একটি রেকর্ড। বর্তমানে তাঁর সম্পদের পরিমাণ ৫১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। তিনি বিশ্বে ধনীদের তালিকায় ৬ নম্বরে আছেন। জুকারবার্গ বিয়ে করেন তার অনেক দিনের পুরনো বন্ধু প্রিসিলা চ্যানকে। এর জন্য তিনি ২০১০ সালে মান্দারিন ভাষা শেখেন। বর্তমানে এই দম্পতির একটি কন্যা সনত্মান আছে। যার নাম ম্যাক্সিমা চ্যান জুকারবার্গ। কন্যা সনত্মান লাভের পর জুকারবার্গ দম্পতি তাদের ফেসবুক শেয়ারের ৯৯% দান করে দেওয়ার ঘোষণা দেন। জুকারবার্গ ফেসবুকের সিইও। তবে এই কাজের জন্য তিনি কোম্পানি থেকে বেতন নেন মাত্র ১ ডলার অর্থাৎ বাংলাদেশের টাকায় ৮০ থেকে ৮২ টাকা।
এমন উদাহরণ আরও অনেক দেওয়া যাবে। তাতে লেখার কলেবর বাড়বে। এ দুজন বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পরিচিত ও আলোচিত বলে তাদের কথা উলেস্নখ করলাম।
পুঁজিবাদ শুধু ভোগবাদকে উসকে দেয়। ফলে সবকিছু ভোগের সামগ্রী করে তোলা হয়। যে কোনো উপায়ে অর্থ উপার্জন করে তা ভোগবিলাসে খরচ করার প্রবণতা তৈরি হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর থেকে আমেরিকার নেতৃত্বে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস’া জেঁকে বসেছে বিশ্বে। ফলে পুঁজিবাদের যে অমানবিক ও নিষ্ঠুর রূপ তা প্রত্যড়্গ করছে বিশ্ববাসী। এই ভোগবাদী সমাজব্যবস’ায় থেকে, বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হওয়ার পরও উন্নত বিশ্বের প্রচুর সংখ্যক ধনী ব্যক্তি মানুষের কল্যাণে অর্থ ব্যয় করে থাকেন। গড়ে তোলেন বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠান। তারা প্রতিবছর প্রচুর অর্থ দান করে থাকেন বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানে। এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় এমন অনেক দাতব্য প্রতিষ্ঠান আছে যা পরিচালিত হয় পশ্চিমা বিশ্বের ধনকুবেরদের টাকায়। আমরা সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে একচেটিয়া পুঁজির বিরোধিতা করতে পারি বটে কিন’ যেহেতু একচেটিয়া পুঁজির বিকাশ বন্ধ করা সম্ভব হয়নি সেহেতু সে পুঁজির কিছু অংশ বঞ্চিত মানুষের কল্যাণে ব্যয় করাকে নিরম্নৎসাহিত করতে পারি না, বাধা দিতে পারি না। আমি জানি না, মার্কসবাদী অর্থনীতিবিদরা বিল গেটস ও মার্ক জুকারবার্গের এই পুঁজিকে কোন শ্রেণির বলে আখ্যায়িত করে থাকেন।
এবার আসি বাংলাদেশের ধনীদের প্রসঙ্গে। এই দেশের ধনী হয়ে ওঠার ইতিহাস দীর্ঘদিনের নয় এবং অধিকাংশের উত্থানও খুব স্বচ্ছ নয়। হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানি ছাড়া বেশিরভাগ কোম্পানিকে নিয়ে নানা রকম বিতর্ক আছে। অনেকের বিরম্নদ্ধে জায়গা দখল, পাহাড় কাটা, ব্যাংকের টাকা পরিশোধ না করার অভিযোগও আছে। দেশের অধিকাংশ শিল্পকারখানার মালিকরা সঠিক আয়কর, কারখানার বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানির বিল পরিশোধ করেন কি না তা নিয়ে জনমনে ঘোরতর সন্দেহ আছে। এদের মধ্যে অনেকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে প্রথমে একটি আলীশান বাড়ি বানান আর দুচারখানা দামি গাড়ি কেনেন। এরা বিলাসিতা পছন্দ করেন। ফলে বাড়ি-গাড়ি ও বিলাসিতায় অর্থব্যয় করার পর যে শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠা করেন তার আয় দিয়ে দেশের বাইরে বাড়ি করবেন না ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করবেন তা সি’র করতে পারেন না। এভাবেও অনেকে ঋণখেলাপিতে পরিণত হন। সম্প্রতি একটি সেমিনারে বলা হয়েছে সামনে ঋণখেলাপির চেয়ে ভুয়া পরিচয়ে ঋণ গ্রহিতারা বড় সংকট তৈরি করবে ব্যাংকিং সেক্টরে।
২. গত সোমবার ইফতার সামগ্রী নিতে গিয়ে প্রচ- ভিড়ে পদদলিত হয়ে মারা গেছেন দশ নারী ও শিশু। দেশের অন্যতম রড প্রস’তকারী প্রতিষ্ঠান কেএসআরএম সাতকানিয়ার নলুয়া ইউনিয়নে ইফতার সামগ্রী বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছিল। শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকের বাড়ি এই এলাকায়। প্রতিবছর তারা রমজানে ইফতার বিতরণ করে নিজ গ্রামবাসীদের মধ্যে। এবার তারা মাইকিং করার ফলে আশেপাশের বেশ কয়েকটি গ্রাম থেকে কারো কারো মতে প্রায় ২০ হাজার নর-নারী জমায়েত হয়েছিল ইফতার সংগ্রহের লড়্গ্যে। এত বিপুল মানুষকে সুশৃঙ্খলভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পড়ার কারণে এমন একটি মর্মানিত্মক ঘটনা ঘটল। অসহায় দরিদ্র ১০জন মারা গেল আর আহত হলো অর্ধশতাধিক নারী ও শিশু। এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জাকাতের কাপড় সংগ্রহ করতে গিয়ে একই এলাকায় ২০০৫ সালে নিহত হয়েছিলেন ৮জন। এই ঘটনায় আহত হয়েছিলেন শতাধিক লোক। তার মানে ১৩ বছর আগে একই ঘটনা ঘটলেও কেএসআরএম কর্তৃপড়্গ এবারও যথাযথ নিরাপত্তামূলক ব্যবস’া গ্রহণ করেনি। ফলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল এ বছরও।
বাংলাদেশে রমজান এলে কিছু কিছু ঘটনা এখন নিয়মে দাঁড়িয়েছে। প্রথম হচ্ছে, যে কোনো, বিশেষ করে রমজান মাসে চাহিদা বাড়ে তেমন পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়া, দ্বিতীয়ত- প্রায় সব পণ্য ভেজাল হওয়া, নকল পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি করা, ঘুষ-দুর্নীতি বৃদ্ধি পাওয়া এবং রোজার ও ঈদের আগে ইফতার এবং জাকাত বিতরণ করা। ইফতার এবং জাকাত বিতরণকালে প্রায় প্রতিবছর দুর্ঘটনা ঘটে। মারা পড়ে গরিব অসহায় মানুষরা। তা নিয়ে দু চারদিন লেখালেখি হবে। টকশোতে আলোচনা হবে এবং যথারীতি ভুলে যাওয়া হবে। এরপর আরেকটি রমজান আসবে একই ঘটনা আবার ঘটবে। এখন প্রশ্ন হলো এ ধরনের ইফতার বিতরণ ও জাকাত প্রদান কতটা ধর্মীয় বিধানসম্মত তা খতিয়ে দেখা। ৩ কেজি চাল, ২ কেজি ছোলা আর একটি শাড়ির দাম কত পড়বে এখন। অথবা জাকাত হিসেবে দেওয়া শাড়ি ও লুঙ্গির দাম? টেরিবাজারে জাকাতের শাড়ি ও লুঙ্গি আলাদাভাবে বিক্রি হয়। অত্যনত্ম কমমূল্যের এই শাড়ি-লুঙ্গি তিন মাসের অধিক ব্যবহারও করা যায় না। অথচ এই জাকাত পাওয়ার জন্য গরিবদের কী দুঃসহ অপেড়্গা আর মৃত্যুঝুঁকি নিতে হচ্ছে বাংলাদেশে। এভাবে আর কোনো মুসলিম দেশে জাকাত দেওয়া হয় কি না তা আমার জানা নেই। এখানে এভাবে জাকাত প্রদানের চেয়ে প্রচারটাই যে মুখ্য তা আর বুঝিয়ে বলার প্রয়োজনও বোধহয় নেই। কিন’ একজন মানুষ হিসেবে আমি ব্যক্তিগতভাবে এই কর্মকা-কে নিন্দা না জানিয়ে পারি না। কারণ কারো আত্মপ্রচারের জন্য মানুষ মারা যাবে আর তার বিনিময়ে দু’তিন লাখ টাকায় সে অপরাধ থেকে কেউ মুক্তি পেয়ে যাবে তা মেনে নেওয়া যায় না। মানুষের প্রাণের বিনিময় অর্থ দিয়ে হতে পারে না। এর আগেও চট্টগ্রামসহ দেশের আরও কয়েকটি স’ানে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। সবকটিই সামান্য অর্থের বিনিময়ে ধামাচাপা ও আপোষরফা করা হয়েছে। কোনোটির জন্য কাউকে বিচার বা সামান্য জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়নি। এই ঘটনারও হবে না। ২০০/২৫০ টাকা দামের মশারির কাপড়ের মতো একটি শাড়ি বা লুঙ্গির জন্য অভুক্ত মানুষদের এত কষ্ট দেওয়া গরিবের সাথে ঠাট্টা ছাড়া আর কিছু নয়।
৩. চট্টগ্রামে একটিও বিশেষায়িত হাসপাতাল নেই। কিডনি, লিভার, হার্ট, ক্যান্সার, ডায়াবেটিক ইত্যাদির মতো জটিল ও ব্যয়বহুল রোগের চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত কোনো হাসপাতাল চট্টগ্রামে নেই। এমনকি শিশুদের জন্যও আলাদা কোনো হাসপাতাল নেই চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালই চট্টগ্রামবাসীর একমাত্র ভরসা। এই হাসপাতালে ধারণ ড়্গমতার বহুগুণ বেশি রোগী ভর্তি থাকে সবসময়। সেখানে চিকিৎসা প্রদানের সীমাবদ্ধতাও আছে অনেক। দেশে তথা চট্টগ্রামে প্রচুর মানুষ ক্যান্সার, কিডনি, লিভার ও হার্টের রোগে আক্রানত্ম হচ্ছে। মধ্যবিত্তরা রাজধানী ঢাকায় এবং এর চেয়ে সামর্থবানরা দেশের বাইরে গিয়ে চিকিৎসা নিতে পারেন কিন’ স্বল্প আয়ের লোকদের চিকিৎসা কোথায় হবে? কীভাবে হবে? চট্টগ্রামের কয়েকটি শিল্প পরিবার মিলেইতো এমন দুয়েকটি হাসপাতাল গড়ে তুলতে পারতো। চট্টগ্রামে প্রতিবছর মেজবানের জন্য যে টাকা খরচ হয় তা দিয়ে প্রতি দু বছরে একটি আধুনিক হাসপাতাল গড়ে তোলা সম্ভব। কিন’ কে শোনে কার কথা। সম্ভবত তারা মনে করেন হাসপাতালের পেছনে টাকা খরচ করলে প্রচার আর কতটুকুইবা হবে। তার চেয়ে মেজবান, ইফতার আর ফলাও করে জাকাত বিতরণ করলে প্রচারটা বেশি হয়।
ধর্মীয় কারণে, আখেরাতের উদ্দেশে মেজবান, ইফতার ও জাকাত বিতরণ করলে তাতো দোষ দিতে পারি না। কিন’ তাতো ধর্মসম্মত হওয়া উচিত। অর্থাৎ উপার্জনটাতো সহি হওয়া উচিত। সাধারণভাবে বলি বৈধ আর ধর্মীয় পরিভাষায় বলি হালাল রম্নজি, তা-ই যদি না হলো তবে এত ঢাকঢোলের বিনিময়ে কী-ইবা অর্জিত হবে মৌলিক শর্তটিই যদি পূরণ না হয়।