আবদুল গাফ্‌ফার খান

মধুসূদন চক্রবর্তী
Untitled-1

সীমান্ত গান্ধী আবদুল গাফফার খানের সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাতের স্মৃতি উল্লেখ করছি। সেবার আমার স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল কী সহজ সরল ও পবিত্র জীবন তিনি যাপন করতেন। ওই বছর হাজারিবাগ জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি শান্তিনিকেতন সহ বাংলার কয়েকটি জেলা সফর করেন। সে-সময় যতটা মনে পড়ে সেপ্টেম্বর মাসে – তিনি কুমিল্লায়ও গিয়েছিলেন। আমি তখন কুমিল্লা কলেজের দ্বিতীয় বার্ষিক শ্রেণির ছাত্র। কান্দিরপার কাশীপুর কম্পাউণ্ডে প্রখ্যাত কংগ্রেস নেতা বসন্তকুমার মজুমদার ও হেমপ্রভা মজুমদারের শহরের বাড়ি। ওই কম্পাউন্ডের মধ্যে একটি ঘর আমরা ক’জন ছাত্র থাকতাম, রান্না বান্না করে খেতাম। আমাদের ঘরের বিপরীত দিকে মজুমদার দম্পতির লম্বা বৈঠকখানাঘরে জেলার কংগ্রেস নেতা ও কর্মীদের সঙ্গে সীমান্ত গান্ধীর আলোচনা-বৈঠকের ব্যবস্থা হয়েছিল। ওই বৈঠকের আগের দিন রাত্রে তিনি কুমিল্লা এসে পৌঁছেছিলেন।
সকালে নির্ধারিত সময়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে একটি কাপড়ের পুঁটলি হাতে তিনি এলেন এবং মাথাটি বেশ নিচু করে ঘরে ঢুকলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন মৌলবী আশরাফউদ্দীন চৌধুরী। তখনো সব লোক এসে হাজির হয়নি। কয়েকখানা চৌকি-জুড়ে তৈরি একটি নিচু মঞ্চে উঠে তিনি হাতের পুঁটলিটি পাশে রেখে দিলেন এবং পুঁটলি থেকে একখানি গ্রন্থ বের করে অনুচ্চ স্বরে কি যেন পাঠ করছিলেন। মঞ্চটি ছিল খদ্দরের কাপড়ে আচ্ছাদিত।
কিছুক্ষণের মধ্যেই শহরের খ্যাত ও অখ্যাত কংগ্রেস কর্মীরা আসতে লাগলেন। অখিলচন্দ্র দত্ত, কামিনী দত্ত, ধীরেন দত্ত, স্বর্ণকমল রায় প্রমুখ বর্ষীয়ান নেতাদের দেখে বাদশা খান মঞ্চের ওপর দাঁড়াতে গেলে দরমার সিলিং-এ মাথা ঠেকে যায়।
তিনি ঘাড় নিচু করে দাঁড়ালেন- মুখে প্রসন্ন হাসি। বলিষ্ঠ দীর্ঘদেহী মানুষটিকে ওই অবস্থায় দেখে উপস্থিত সকলেই হেসে উঠেছিলেন। সীমান্ত গান্ধীকে জনমণ্ডলীর নিকট পরিচয করিয়ে দিতে উঠে আশরাফউদ্দীন চৌধুরী বললেন: সূর্য ওঠার আগেই খান সাহেব তাঁর আবাসস্থলের নিকটবর্তী পুকুরে গিয়ে হাত মুখ ধোয়ার পর নিজের কাপড় জামা কাচেন ‘বাংলা সাবান’ দিয়েমোটা খদ্দরের জামা কাপড়- সেগুলি ধুয়ে নিজেই বয়ে এসে ঘরৈর বাইরে শুকাতে দেন।
তাঁর জন্য নির্দিষ্ট কাজের লোক হিসেবে একজন স্বেচ্ছাসেবককে নিযুক্ত করা সত্ত্বেও তিনি তাঁর ব্যক্তিগত কাজকর্ম নিজেই করেন। ওই সময়ই শূনেছিলাম জেলখানায় কি বাইরে সব সময়েই বাদশা খান নিজের জামা কাপড় নিজেই পরিস্কার করতেন। কারও ওপর নির্ভর করা ছিলো তাঁর স্বাভাবিরুদ্ধ।
ওই সমাবেশে বাদশা খান উর্দুতে তাঁর বক্তব্য রাখেন। আর আশরাফউদ্দীন চৌধুরী বাংলায় তর্জমা করে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন। কেউ কেউ তাঁকে কংগ্রেসের কর্মসূচী সম্বন্ধেও প্রশ্ন করেন।
এন্ডারসনী দমন-পীড়নে সমগ্র বাঙলা- বিশেষ করে পূর্ব বাংলার জেলাগুলির দেশকর্মীরা সে সময় পর্যুদস্ত।
এরই পটভূমিকায় বাদশা খান তাঁর বক্তব্য রাখেন। তাঁর বক্তৃতার বিষয়বস্তু ছিল জাতীয় কংগ্রেসকে শক্তিশালী করে তুলে, মহাত্মা গান্ধীর সত্য, প্রেম ও অহিংসার নীতি ও আদর্শের অনুসারী হয়ে সাম্প্রদায়িকতা ও অস্পৃশ্যতা দূর করা, গ্রাম সংগঠনের কাজ জোরদার করা ইত্যাদি।
সীমান্ত গান্ধীর বক্তৃতার চেয়েও আমাকে সেদিন আকৃষ্ট করেছিল তাঁর স্বাবলম্বন এবং অতি সহজ সরল জীবনযাত্রা।
তিনি এমন একটি মানুষ ছিলেন- গান্ধীজীর একনিষ্ঠ অনুরাগী হিসাবে যিনি ‘আপনি আচরি ধর্ম’ পরকে শিখিয়েছেন।
পরবর্তীকালে সাংবাদিক জীবনে কয়েকবার তাঁর সান্নিধ্যে এসেছি- শেষবার ১৯৬৯ সালের ডিসেম্বর মাসে শান্তিনিকেতনে। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখার্জির মাধ্যমে বাদশা খানের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগটি ঘটেছিল উদয়ন-গৃহে। কিন্তু ছাত্রজীবনে এরূপ একজন মহান দেশপ্রেমিক, ‘ঈশ্বরের প্রকৃত সেবকের‘ দর্শন আমার জীবনে এক মাহেন্দ্রক্ষণরূপে চিহ্নিত হয়ে আছে। (সংক্ষেপিত)