আপিলই গৃহকর কমানোর একমাত্র উপায় : মেয়র

নিজস্ব প্রতিবেদক
CCC_Press-Brief-(5)

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেছেন, ‘আইন তৈরি বা সংশোধনের ক্ষমতা আমার নেই। সংবিধানের মাধ্যমে আইন তৈরি হয়। গৃহকর পুনর্মূল্যায়ন প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। ২০১৬ সালের আদর্শ কর তফসিল অনুযায়ী ২৭ শতাংশ কর নির্ধারণের সুযোগ থাকলেও আমরা আগের ১৭ শতাংশ করই আদায় করছি। ভাড়ার বাইরে গৃহকর নির্ধারণের এখতিয়ার ও ক্ষমতা আমার নেই। মিথ্যাচার ও বিভ্রান্তি না করে বোঝার চেষ্টা করুন।
চোখ থাকতেও অন্ধ আর কান থাকতেও বধির হলে আমার কিছু করার নেই।’
গতকাল বুধবার দুপুরে নগর ভবনের কেবি আবদুচ ছত্তার মিলনায়তনে
ইমরাত ও জমির পঞ্চবার্ষিকী মূল্য নির্ধারণ বিষয়ে চসিক আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মেয়র এসব কথা বলেন।
গৃহকর নিয়ে সম্প্রতি সৃষ্ট উত্তেজনা প্রসঙ্গে আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, ‘গৃহকর নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। অথচ আজ পর্যন্ত আমরা সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ দিলে আমরা আন্তরিকতার সাথে বিবেচনা করবো। গৃহকর নিয়ে সৃষ্ট বিভ্রান্তির সমাধানের একমাত্র উপায় আপিল করা। আপিলের কোন বিকল্প নেই। আপিলে কাউন্সিলরদের সহযোগিতায় করদাতাদেরকে যত রকমের ছাড় দেওয়া যায়, তা দেওয়া হবে।’
গৃহকরের বিরুদ্ধে নগর আওয়ামী লীগের আলটিমেটাম এবং আগামী নির্বাচন সম্পর্কিত সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, ‘আমি মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। দলের প্রতি আমারও দরদ কম নয়। আমার জবাব জনগণের কাছে। জনগণ বোকা নয়। চসিকের গৃহকরের উপর আওয়ামী লীগের ভোট নির্ভর করবে না। আমি মন্ত্রণালয়কে টাইম টু টাইম অবহিত করছি। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় চলছি। আগে আইন কাগজে-কলমে ছিল। জবাবদিহিতা ছিল না। এখন জবাবদিহিতা আছে।’
তিনি বলেন, ‘সাধারণ নাগরিকের মধ্যে আইনি কাঠামো-কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা নেই। এটাকে অনেকে কাজে লাগাতে চায়। এক্ষেত্রে নাগরিকদের সকল সংকীর্ণতা পরিহার করা উচিত। আমি সবার কাছ থেকে সহযোগিতা চাই। বাকি সময়ের মধ্যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির সকল ওয়াদা পূরণ করে একটি পরিপাটি শহর উপহার দেবো।’
১০-২০ গুণ এমনকি ৫০ গুণ পর্যন্ত গৃহকর বাড়ানো হয়েছে এমন অভিযোগ অস্বীকার করে মেয়র জানান, প্রাথমিকভাবে সম্পন্ন করা এই অ্যাসেসমেন্টে সর্বমোট ১ লাখ ৮৫ হাজার ২৪৮টি হোল্ডিংয়ের বিপরীতে প্রস্তাবিত বার্ষিক কর ও রেইট ৮৫১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এর মধ্যে নতুন ২৮ হাজার ৭০২টি হোল্ডিংয়ের বিপরীতে কর ও রেইট ৪৭ কোটি ৪৯ লক্ষ টাকা। ২০০৮-০৯ হতে ২০১১-১২ অর্থবছর পর্যন্ত এবং সে সময় হতে ২০১৫-১৬ সাল পর্যন্ত কোয়াটারলি এসেসমেন্টসহ পূর্বের এসেসমেন্ট অনুযায়ী ধার্যকৃত মোট দাবির পরিমাণ ছিল ২০০ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। বর্তমান অ্যাসেসমেন্ট হতে নতুন হোল্ডিংয়ের বিপরীতে ধার্যকৃত কর ও রেইট বাদ দিলে মোট দাবির পরিমাণ প্রায় ৮০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ পূর্বের এসেসমেন্টের তুলনায় বর্তমানে দাবির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৪ গুণ। অথচ সিটি করপোরেশন কর তফসিল ২০১৬ অনুযায়ী ইমারত ও জমির উপর কর ৭ শতাংশ, ময়লা নিষ্কাশন রেইট ৭ শতাংশ, সড়ক-বাতি ৫ শতাংশ ও স্বাস’্য কর ৮ শতাংশ অর্থাৎ সর্বমোট ২৭ শতাংশ কর ও রেইট নেওয়ার বিধান থাকলেও চসিক নগরবাসীর সুবিধার্থে পূর্বের ন্যায় ১৭ শতাংশ এবং কোন কোন ওয়ার্ডে ১৪ শতাংশ কর আদায় করার সিদ্ধান্ত অব্যাহত রেখেছে।
চসিকের প্রদেয় সেবার বিপরীতে নাগরিকরা কি পরিমাণ অর্থ দেন, তার একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেন, ‘এই শহরের ক্রমবর্ধমান জনগণকে সেবা প্রদান ও উন্নয়ন কার্যক্রমের ব্যয় বেড়েছে অনেক বেশি। ২০০৯-১০ অর্থবছরে চসিকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতা বাবদ ব্যয় ছিল ৭১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এই খাতে ব্যয় ১৯১ কোটি ৭১ লাখ টাকা। ২০১০-১১ অর্থবছরের পরিচালনা ও উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস’াপনা এবং সড়ক বাতি ও বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় ছিল ১৭৮ কোটি ৩৭ লক্ষ টাকা। ২০১৬-১৭ আর্থিক সনে এই ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে ৫৬৭ কোটি ৬৯ লক্ষ টাকায় উন্নীত হয়।’
মেয়র প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘এই বিপুল ব্যয় বেসরকারি খাতে পরিশোধিত কর ও রেইটের অবদান কতটুকু? সর্বশেষ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পরিচালনা ও উন্নয়ন খাতে ৪৫৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ব্যয়ের বিপরীতে বেসরকারি করদাতাদের অবদান ছিল মাত্র ২৩ কোটি ৭০ লাথ টাকা এবং সরকারি-বেসরকারি অবদান ছিল মাত্র ৪০ কোটি ৭১ লাখ টাকা। একইভাবে বর্জ্য ব্যবস’াপনার জন্য ৭৯ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ের বিপরীতে বেসরকারি হোল্ডিং থেকে আদায় হয় মাত্র ১৮ কোটি ৬২ লাখ টাকা। আলোকায়ন ও বিদ্যুৎ খাতে ৩৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয় করা হলেও সর্বমোট আদায় হয় মাত্র ২০ কোটি ২ লাখ টাকা। যার মধ্যে বেসরকারি আদায় মাত্র ১০ কোটি ১৬ লাখ টাকা। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আদায়ের হারের তুলনায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কর আদায় অর্ধেকেরও কম। অথচ এটি বন্দর নগরী হওয়ায় প্রতিনিয়ত ভারী যানবাহনের প্রবেশ এবং জলাবদ্ধতার কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতি মিলে এই করপোরেশনের ব্যয় অনেক বেশি।’
সংবাদ সম্মেলনে চসিক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামসুদ্দোহা, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান, প্যানেল মেয়র চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী, কাউন্সিলর সাইয়েদ গোলাম হায়দার মিন্টু, মো. গিয়াস উদ্দিন, হাসান মুরাদ বিপ্লব, শৈবাল দাশ সুমন, জহুরুল আলম জসিম, এস এম এরশাদুল্লাহ, মো. ইসমাইল বালী, সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর আাঞ্জুমান আরা বেগম ও আবিদা আজাদ উপসি’ত ছিলেন।