আন্দরকিল্লায় ভাঙা হচ্ছে দেড়শ’ বছরের বাড়ি

স্মৃতি ধরে রাখতে প্রদর্শনী

সিফায়াত উল্লাহ
আন্দরকিল্লা আইন কলেজের সামনে ব্রিটিশ আমলে তৈরি দু’তলা বাড়িটি ভাঙার প্রস্তুতি চলছে -সুপ্রভাত
আন্দরকিল্লা আইন কলেজের সামনে ব্রিটিশ আমলে তৈরি দু’তলা বাড়িটি ভাঙার প্রস্তুতি চলছে -সুপ্রভাত

ব্রিটিশ স্থাপত্যকলার নিদর্শন খচিত বাড়িটির দরজা, জানালা, দেয়ালের গায়ে পরতে পরতে ফেলে আসা সময়ের অদৃশ্য চিত্রমালা। ১৮৬৪ সালে এই বাড়িটির নির্মাণ করা হয়। ব্রিটিশ আমলে তৈরি বাড়িটির প্রতিটি জায়গায় ছড়িয়ে আছে এখানে বসবাসকারী বাসিন্দাদের নানা স্মৃতি। এখনো তাদের কাছে ফেলে আসা স্মৃতিগুলো এই বাড়িটির দেয়ালে ভেসে উঠে। একসময় প্রাণ-প্রাচুর্য্যে ও কোলাহলে মুখর বাড়িটি অপেক্ষায় আছে নতুন এক রূপ লাভের আশায়। সেজন্য কোলাহলমুখর বাড়িটি ছেড়ে গেছেন এর বাসিন্দারা। সপ্তাহ খানেক পরই শুরু হবে বাড়িটি ভাঙার কাজ। বলছি নগরীর আন্দরকিল্লা আইন কলেজের সামনে ব্রিটিশ আমলে তৈরি দু’তলা বাড়িটির কথা।
এই বাড়িটি নির্মাণ করেন ওই এলাকার বাসিন্দা ডা. ওমর ইউসুফ। বংশ পরম্পরায় সেখানে বসবাস করে আসছিলেন তার পুত্র এ এফ এম ইউসুফ ও নাতি ওমর ফারুক ইউসুফরা। একসময় বাড়িটি ছিল কোলাহলমুখর। কিন’ বছরখানেক আগে নতুন আঙ্গিকে তৈরি হওয়ার জন্য বাড়িটি ছেড়ে গেছেন বসবাসকারীরা। পরিবারের সদস্যদের বরাতে প্রদর্শনীর আয়োজকরা জানান, বাড়িটির মালিকদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেড়ে গেছে। তাই দু’তলা বাড়িটাতে সবাই একসাথে বসবাস করা সম্ভব হচ্ছে না। সেজন্য বহুতল ভবন নির্মাণ করার জন্য বাড়িটি ভাঙা হচ্ছে।
তবে বাড়িটির কর্তা ওমর ফারুক ইউসুফ ও শোয়েব ইউসুফ শেষবারের মতো বাড়িটিকে মানুষের কাছে তুলে ধরতে চান। সেজন্য তাদের সহযোগিতায় শুক্র ও শনিবার সন্তরণ আর্ট অর্গানাইজেশন বাড়িটিতে দুই দিনের স’াননির্ভর শিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করে। শুক্রবার বিকেলে প্রদর্শনীর উদ্বোধনীতে বাড়ির সদস্যরা সবাই আসেন। প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন ১২ জন শিল্পী। এসব শিল্পীর কারুকার্যে উঠে এসেছে বাড়িটির বিভিন্ন নির্দশন ও বসবাসকারী বাসিন্দাদের স্মৃতিগুলো।
শনিবার বাড়িটি ঘুরে চোখে পড়ে নানা রঙের জ্বলতে থাকা বাতি, রুমে রুমে বিভিন্ন ডিজাইনের সাজসজ্জা আর নানা শ্রেণি পেশার মানুষের আনাগোনা। প্রদর্শনী দেখতে এসেছেন চট্টগ্রাম চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক যুবরাজ। এক ফাঁকে সুপ্রভাতকে তিনি বলেন, ‘একটি বাড়িতে একজন মানুষ যখন বসবাস করে, তখন সেই বাড়িকে ঘিরে তার কত স্বপ্ন বেড়ে ওঠে। কিন’ কালের পরিক্রমা একদিন হয়তো স্বপ্নগুলো ভেঙে যায়। এ বাড়িটিও সেরকম ঘটনার সাক্ষী।’ তিনি আরো বলেন, ‘শিল্পীদের কাজ হচ্ছে মানুষের চোখের সামনে লুকায়িত জিনিসগুলো তুলে ধরা। তারা কাজগুলো করেন শুধু মনের আনন্দে। নিজেদের টাকায় শিল্পীরা এ কাজগুলো করে।’
চট্টগ্রামের ঐতিহ্য নিদর্শন মানুষকে তুলে ধরায় প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য উল্লেখ করে প্রদশর্নীর সমন্বয়ক মনজুর আহমেদ বলেন, ‘শতবর্ষী দালান সম্পর্কে মানুষ জানবে। জানবে চট্টগ্রাম শহর যে অনেক পুরনো সেটা। আমরা চেয়েছি ভবনটির শিল্পকর্মগুলো মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে দিতে। আশা করি মানুষের কাছে সে বার্তা আমরা পৌঁছাতে পেরেছি।’
ঐতিহাসিক স’াপনাগুলো সমাজের স্মৃতি উল্লেখ করে নগর পুরাকীর্তিবিদ সামশুল হোসাইন বাহাদুর সুপ্রভাতকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম হচ্ছে উপমহাদেশের সবচেয়ে পুরাতন নগরী। আর আন্দরকিল্লা হচ্ছে চট্টগ্রামের নগরকেন্দ্র। এরকম একটা জায়গার প্রায় ২০০ বছরের পুরনো স’াপনা ভেঙে ফেলা আমাদের জন্য সত্যিই দুঃখজনক। এভাবে চলতে থাকলে একসময় ঐতিহাসিক স’াপনাগুলো আমাদের কাছ থেকে বিলীন হয়ে যাবে। এতে তরুণ প্রজন্ম বঞ্চিত হবে ইতিহাস, ঐতিহ্যগুলো সম্পর্কে জানতে।
প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এসব স’াপনা রক্ষায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন দেশের পুরাতন স’াপনাগুলো রক্ষা করতে। তাই নগরীর সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে।’=