আনন্দে ভরে উঠুক পঁচিশে বৈশাখ

সাঈদুল আরেফীন
f10d9-picture

ছোট্টবন্ধুরা, বছর ঘুরে এসেছে আবারো ২৫ বৈশাখ। কলিকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার আলোকিত করে ৭ মে ১৮৬১ সনে জন্ম গ্রহণ করেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এ দিনটি মানেই বাঙালি জাতির জীবনে আরেকটি উৎসবমুখর দিন। ছোট্টবন্ধুরা বছর ঘুরেই আবারো এই তপ্ত বৈশাখেই আমরা স্মরণ করতে যাচ্ছি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি কবিকুল শিরোমণি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫৬ তম জন্মবার্ষিকী। কী অবাক করা ব্যাপার তাই না বন্ধুরা ? দেখতে দেখতেই অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গেছে। কবি আমাদের কাছে বরাবরই আপন। কবির লেখায় কবির সৃষ্টিকর্মে আমরা প্রতিনিয়ত মুগ্ধ হই। বিস্মিত হই তাঁর রচিত সাহিত্য পড়ে। তিনি শিশুদের জন্য লিখেছেন অনেক। ছড়া কবিতা গল্প কোনটাই শিশুদের জন্য কম লিখেননি। কবির লেখাগুলো পড়ে আমরা বড়ো হই। উচ্চশ্রেণিতেও তাঁর লেখা পাঠে আমরা মনোনিবেশ করি। ছোটবেলা থেকেই অসামান্য মেধা নিয়ে জন্মেছেন এই কবি। ছোট্টবন্ধুরা, কবিগুরুর বিশাল জীবন ও সাহিত্য অনেক চমকপ্রদ। তোমাদের জন্য তিনি পোস্টমাস্টার, রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা, খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন, কাবুলিওয়ালা, ছুটি, বলাই এর মতো ভালোলাগা সব গল্প উপহার দিয়েছেন, যা আমাদের সাহিত্যকে অনেক অনেক বেশি সমৃদ্ধ করেছে।
১৮৮৪ সালে প্রথম গদ্য নাটক ‘নলিনী’ লিখলেন কবিগুরু। ১৮৯২ সালে বিখ্যাত ‘সোনার তরী’ কবিতা লিখলেন কবি। যেটি প্রকাশ পায় ১৮৯৪ সালে। ১৯২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে কবি আসেন ঢাকায়। ৭ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা, ময়মনসিংহ, আগরতলা, কুমিল্লা, চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জ ঘুরে বেড়িয়েছেন। পরে ফিরে যান কলকাতায়। ১৯০৩ সালে তিনি বরিশাল ও চট্টগ্রাম সফর করেন। শুধু কী দেশে রবীন্দ্রনাথ চষে বেড়িয়েছেন। বিদেশের মাটিতেও তিনি অনেক বেশি পা রেেেখছেন। নিজের সাহিত্যকে বিলিয়ে দিয়েছেন। সূদুর আমেরিকা ব্রিটেন, ফ্রান্স, সুইডেন। ১৯১০ সালের ১৫ আগস্ট কবির ঐতিহাসিক সৃষ্টি ‘গীতাঞ্জলি’ ছাপা হয়। ১৯১৩ সালের ১৩ নভেম্বর ‘গীতাঞ্জলি’র নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হবার খবর আসে শান্তি নিকেতনে। ‘গীতাঞ্জলি’ রচনা করতে গিয়ে কবিকে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়েছে। মাত্র ৯০ দিনে রচনা করেন গীতাঞ্জলির ১৩৭টি গান ও কবিতা।
১৮৯০ সালে পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর কবিকে পরীক্ষামূলকভাবে জমিদারি দেখভাল করার দায়িত্ব অর্পণ করেন । জমিদারি করতে এসে রাজশাহীর সাজাদপুর, পতিসর ও কুষ্টিয়ার শিলাইদহে লিখেন অসংখ্য কবিতা। ১৮৯১ থেকে ১৯০১সালে কবি পদ্মার বুকে অবিরাম ছুটে বেড়িয়েছেন নৌকোয় করে। ওই সময়টাতে কবি প্রকৃতির সাথে মানুষের সাথে মিশেছেন নিবিড়ভাবে। অনুজ কবির প্রতি কবির মমত্ববোধও কম ছিলো না। তাইতো তিনি ১৯২৩ সালে কবিগুরু কারারুদ্ধ বিদ্রোহী কবি নজরুলকে উৎসর্গ করেন তাঁর ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য। এই গীতিনাট্য উৎসর্গ করতে গিয়ে কবিগুরু উল্লেখ করেন,জাতির জীবনে বসন্ত এনেছে নজরুল। তাই আমার সদ্য প্রকাশিত বসন্ত গীতিনাট্যখানি ওকেই আমি উৎসর্গ করেছি।” শৈশব থেকেই কবিগুরুকে বিদ্রোহী কবি নজরুল শ্রদ্ধা করতেন। বিদ্রোহী কবি কবিগুরুর গীতাঞ্জলি মুখস্থ করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পুরাতন ভৃত্য ও দুই বিঘা জমি সহ অসংখ্য কবিতা আবৃত্তি করতেন। অত্যন্ত দরদ দিয়ে গাইতেন রবীন্দ্রসঙ্গীত।
তিনি কেবল কবিই ছিলেন না ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। চিত্রশিল্পী হিসেবেও সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন কবি। ১৯৩০ সালের ২ মে কবির প্রথম চিত্র প্রদর্শনী হয় ফ্রান্সের প্যারিসে। এতে ১২৫টি ছবি প্রদর্শিত হয়। নাটক গান ও চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা অসাধারণ। ১৯৩২ সালে কবিগুরু রচিত প্রথম সবাক চলচ্চিত্র‘ চিরকুমার সভা’ মুক্তি পায়, যা ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্রেরর অন্যতম ইতিহাস হয়ে আছে। তিনি জমিদার হিসেবেও ছিলেন সফল। কৃষি শিল্প স্থাপনেও দক্ষতার পরিচয় দেন কবি। শিলাইদহে ৮০ বিঘা কৃষিজমিতে সার, পম্পসেট, ট্রাক্টর ব্যবহার করেন। কৃষিকে গবেষণায় পরিণত করে তিনি নানা যন্ত্রপাতির ব্যবহার প্রচলন করেন, যা ছিলো ভারত উপমহাদেশে প্রথম। ছোট্ট বন্ধুরা, ছোট্ট পরিসরে কবিগুরুকে চেনা বা জানা সম্ভব নয়। কবির বিশাল সাহিত্যভাণ্ডার ও কবিগুরুকে জানতে হলে কবিগুরুর বই পড়তে হবে বেশি বেশি করে। সেই সাথে কবির জন্মদিনে আমাদের চাওয়া পঁচিশে বৈশাখ উৎসবে আনন্দে ভরে ঊঠুক।