আদিম সম্বল

কাজী আবদুল ওদুদ

‘আদিম সম্বল’ নাম দিয়ে একটি ছোট লেখা রবীন্দ্রনাথ প্রকাশ করেন ১২৯৯ সালের আষাঢ় সংখ্যার ‘সাধনা’য়। রবীন্দ্র রচনাবলীতে সেটি ‘সমাজে’র পরিশিষ্টভাগে স’ান পেয়েছে। অনেকদিন পূর্বে-কবির একত্রিশ বৎসর বয়সে-এটি লেখা। কবির যে সব বিখ্যাত প্রবন্ধ, অর্থাৎ যে সব প্রবন্ধ ভাবে ও ভাষায় চমৎকার আর তাদের সেই চমৎকারিত্ব ব্যাপক স্বীকৃতি লাভ করেছে, এ লেখাটিকে সে সবের একটি জ্ঞান করা হয় না-অন্তত কোনো কোনো বন্ধুকে এই ধরনের মত ব্যক্ত করতে দেখেছি। কিন’ কবুল করতে লজ্জা নেই-এই লেখাটি আমার বিশেষ প্রিয়। মনে হয় এই ছোট্ট লেখাটিতে, এর অনেকটা অমার্জিত শ্রীর ভিতর দিয়ে, প্রকাশ পেয়েছে, যে আদিম সম্বলে কবি বিশেষভাবে সমৃদ্ধ ছিলেন আর তাঁর দেশের লোক যাতে লক্ষণীয়ভাবে বঞ্চিত, তারই খানিকটা।
কি সেই আদিম সম্বল?
কোনো ভূমিকা না করে কবি লেখাটি আরম্ভ করেছেন এইভাবে: ‘যে জাতি নুতন জীবন আরম্ভ করিতেছে, তাহার বিশ্বাসের বল থাকা চাই। বিশ্বাস বলিতে কতোগুলা অমূলক বিশ্বাস বা গোঁড়ামির কথা বলি না। কিন’ কতকগুলি দ্রুব সত্য আছে, যাহা সকল জাতিরই জীবনের মূলধন, যাহা চিরদিনের পৈতৃক সম্পত্তি, এবং যাহা অনেক জাতি সাবালক হইয়া উড়াইয়া দেয় অথবা কোনো কাজে না খাটাইয়া মাটির নিচে পুঁতিয়া যক্ষের জিম্মায় সমর্পণ করে।’ এই ধ্রুব সত্য বলতে কবি বুঝেছেন দুটি ‘বিশ্বাস’। তার প্রথমটি সম্বন্ধে বলেছেন: ‘যেমন একটা আছে স্বাধীনতার প্রতি বিশ্বাস, অর্থাৎ আর একজন কেহ ঘাড় ধরিয়া আমার কোনো স’ায়ী উপকার করিতে পারে একথা কিছুতে মনে লয় না, আমার চোখে ঠুলি দিয়ে আর একজন যে আমাকে মহত্ত্বের পথে লইয়া যাইতে পারে একথা স্বভাবতই অসংগত এবং অসহ্য মনে হয়; কারণ, যাহাতে মনুষ্যত্বের অপমান হয় তাহা কখনই উন্নতির পথ হইতে পারে না। আমার যেখানে স্বাভাবিক অধিকার সেখানে আর একজনের কর্তৃত্ব যে সহ্য করিতে পারে সে আদিম মনুষ্যত্ব হারাইয়াছে।
আর দ্বিতীয়টি সম্বন্ধে তিনি বলেছেন: ‘স্বাধীনতাপ্রিয়তা যেমন উক্ত আদিম মনুষ্যত্বের একটি অঙ্গ তেমনি সত্যপ্রিয়তা আর একটি। ছলনার প্রতি যে একটা ঘৃণা সে ফলাফল বিচার করিয়া নহে, সে একট সহজ উন্নত সরলতার গুণে। যেমন যুবরপুরুষ সহজে ঋজু হইয়া দাঁড়াইতে পারে তেমনি স্বভাবসুস’ যুবকজাতি সহজেই সত্যাচরণ করে।
স্বাধীনতা-প্রিয়তা এবং সত্য-প্রিয়তা এই দুটিকে যে কবি ধ্রুব সত্য, সকল জাতির মূলধন, সকল জাতির, চিরদিনের পৈতৃক সম্পত্তি, এই সব আখ্যায় আখ্যায়িত করলেন, তিনি জানেন তাঁর এই চিন্তার বিরুদ্ধেও যুক্তিতর্ক দাঁড় করানো যেতে পারে। কিন’ সেই লেখাটিতে দেখা যাচ্ছে, সেই তর্ককে খুব ফলাও করে দাঁড় করাবার প্রয়োজন তিনি দেখেননি, কেননা, এই বিষয়ে তিনি নিঃসন্দেহে যে, সেসব তর্ক কুতর্ক। প্রতিপক্ষের বক্তব্য তিনি দাঁড় করিয়েছেন এইভাবে:
কোনো বয়স্ক বিজ্ঞলোক এমন মনে করিতে পারেন কথাটা সম্পূর্ণ সত্য নহে, আমার স্বাভাবিক অধিকার থাকিলেও আমার স্বাভাবিক যোগ্যতা না থাকিতেও পারে, অতএব সেইরূপ স’লে অধীনতা স্বীকার করাই যুক্সিংগত। কিন’ এই তর্ককে কবি চুকিয়ে দিয়েছেন এই একটি কথায়:
‘কথাটা যেমনি প্রামাণিক হোক তবু একথা বলিতেই হইবে, যে জাতির মাথায় এমন যুক্তির উদয় হইয়াছে তাহার যাহা হইবার তাহা হইয়া গেছে।’
কবি তাঁর এতবড় বিশ্বাসের কথা বললেন। কিন’ কবি জানতেন এবং আমরা একালে বিশেষভাবেই জানি যে, একালে তাঁর এই প্রবল প্রত্যয়ের বিরুদ্ধে যুক্তি কম প্রবল নয়-সেই যুক্তি কাজও করে যাচ্ছে দোর্দণ্ডপ্রতাপে। একালে মানুষের উন্নতি, মানুষের শক্তি ও সার্থকতা বৃদ্ধি, এসবের নামে মানুষের স্বাধীনতাকে যেমন নির্মমভাবে কেটে ছেঁটে ফেলতে চেষ্টা করা হয়েছে, ইয়োরোপের মধ্যযুগে ভিন্ন আর কোনো কালে যে তা হয়েছে তা মনে হয় না।
কিন’ এও সত্য যে কালের ধারা কোনোখানে আটকে যায়নি, তা চলছেই, সেই চলন্ত কালের দিকে তাকিয়ে একালেও আমরা সাহস করে বলতে পারি-কবির সিদ্ধান্ত সত্য, স্বাধীনতা আর সত্য-প্রিয়তা সত্যই মানুষের আদিম সম্বল তা যত ভাবেই সেই সম্বল বিঘ্নিত হোক, সেই সম্বল ভিন্ন মানুষের অন্তরাত্মার যেন আর কিছুতেই তৃপ্তি নেই। একালের বীর-সাহিত্যিক পাস্তেরনাক তাঁর নায়ক জিভাগোর মুখে সেই আদিম সম্বলের কথা ব্যক্ত করেছেন এইভাবে:
জোরজাবরদস্তির দ্বারা কিছুই লাভ হবার নয়। ভালোর দিক মানুষকে আকর্ষণ করতে হবে ভালোত্বের দ্বারাই।
কবি সূচনায়ই বলেছেন, যে জাতি নতুন জীবন আরম্ভ করেছে তার জন্য স্বাধীনতা ও সত্যপ্রিয়তা, মানুষের এই দুই আদিম সম্বল অপরিহার্য; আর এই প্রশ্ন তুলেছেন; আমরা নিজেদের কি বলে জানব-পুরাতন জাতি না নতুন জাতি। আমরা যে একটি পুরাতন জাতি তাতো নিঃসন্দেহ; কিন’ কবি বলতে চেয়েছেন, নতুন শিক্ষার সঙ্গে একটি নতুন জাতীয় ভাবের আস্বাদ আমরা পেয়েছি, সেই আস্বাদ বা আমাদের সেই চেতনা অশেষ প্রতিশ্রুতিপূর্ণ, তাই নিজেদের একটি নতুন জাতি জ্ঞান করে সেই চেতনার পথেই নতুন জাতির মতো স্বাধীনতাপ্রিয়তা ও সত্যপ্রিয়তা এই দুই আদিম সম্বলে সমৃদ্ধ হয়ে আমাদের অগ্রসর হতে হবে।
কবি তাঁর এই লেখাটিতে জাতি বলতে নব্য বাঙালি জাতি বুঝেছেন। কিন’ আমরা সবাই জানি, পরে তিনি আমাদের জাতীয়ত্ব বলতে আমাদের সর্বভারতীয়ত্বই বুঝেছিলেন, আর সেই সর্বভারতীয়ত্ব বিশ্বমানবত্বের সঙ্গে অসমঞ্জস নয় বরং সুসমঞ্জস। জাতির অন্তরে এমন নতুন চেতনার সঞ্চারের ফলে জাতির যে নতুন সার্থকতা লাভের সম্ভাবনা রয়েছে তার ছবি সেই দিনে কবির চোখে প্রতিভাত হয়েছিল এইভাবে:
‘…ধীরে ধীরে মনের মধ্যে এক নতুন সংকল্পের অভ্যুদয় হইতেছে যে, আমাদের স্বদেশের এই সমস্ত সমবেত হৃদয়কে অসীম কালক্ষেত্রের মাঝখানে পরিপূর্ণ আকারে উদভিন্ন করিয়া তুলিতে হইবে। সমস্তের মধ্যে এক জীবনপ্রবাহ সঞ্চারিত করিয়া দিয়া এক অপূর্ব বলশালী বিরাট পুরুষকে জাগ্রত করিতে হইবে; আমাদের দেশ একটি বিশেষ স্বতন্ত্র দেহ ধারণ করিয়া বিপুল নরসমাজে আপনার স্বাধীন অধিকার লাভ করিবে; এই বিশ্বব্যাপী চলাচলের হাটে অসঙ্কোচে অসীম জনতার মধ্যে নিরলস নির্ভীক হইয়া আদান-প্রদান করিতে থাকিবে; তাহার জ্ঞানের খনি, তাহার কর্মের ক্ষেত্র, তাহার প্রেমের পথ সর্বত্র উদঘাটিত হইয়া যাইবে।’
যৌবনে দেশের ও জাতির নতুন সার্থকতা লাভের যে স্বপ্ন কবি দেখেছিলেন, বলা যেতে পারে, সেই স্বপ্নই দেখেছিলেন তিনি সারা জীবন ধরে সমস্ত প্রতিকূলতা সমস্ত ব্যর্থতার ভিতর দিয়েও। আর যে আদিম সম্বলে তিনি তাঁর জাতিকে সমৃদ্ধ দেখতে চেয়েছিলেন সেই সমৃদ্ধিলাভের সৌভাগ্য থেকে তাঁর জাতি আজো অর্থাৎ স্বাধীনতা লাভের পরও বঞ্চিত থাকলেও সেই সমৃদ্ধিই যে দিব্য দীপ্তি সঞ্চার করেছিল তাঁর ব্যক্তিত্বে তা সত্য। স্বাধীনতা-প্রিয়তা আর সত্য-প্রিয়তার দ্বারা চির-উজ্জ্বল কবির সেই ব্যক্তিত্ব তাঁর দেশ ও জাতির গতিপথ আলোকিত করে চলুক।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-শতবার্ষিকী স্মারকগ্রন’ থেকে সংকলিত