নগরীতে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন

‘আদিবাসীদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারকে দায়িত্বশীল হতে হবে’

নিজস্ব প্রতিবেদক

নগরে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের আলোচনায় আদিবাসীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি না করে তাদেরকে ঐক্যদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে আদিবাসীদের জীবনমান উন্নয়নে সরকারকে দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান বক্তারা।
গতকাল সকাল সাড়ে ১১টায় নগরের মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে র্যালি, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম-চট্টগ্রাম অঞ্চল এই অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে।
সকাল ১০টায় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করেন নারীনেত্রী ও মানবাধিকারকর্মী নূরজাহান খান। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম-চট্টগ্রাম অঞ্চলের সভাপতি শরৎজ্যোতি চাকমার সভাপতিত্বে উদ্বোধনীপর্বে বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মহিউদ্দিন মাহিম, একই বিভাগের আরেক সহকারী অধ্যাপক বসুমিত্র চাকমা। উদ্বোধনী বক্তব্যে নূরজাহান খান বলেন, আমরা সবাই বাংলাদেশি। এদেশে বাস করার অধিকার সকলের সমান। কেন আদিবাসীরা দেশ থেকে বিতাড়িত হবে, তা রাষ্ট্রকে জবাব দিতে হবে। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে হলে দেশের সকল নাগরিককে তাদের অধিকার ভোগ করতে দিতে হবে বলে অভিমত প্রকাশ করেন নূরজাহান খান। এই পর্ব শেষে একটি র্যালি শহীদ মিনার থেকে নিউমার্কেট মোড় হয়ে কোতোয়ালি ঘুরে আবার শহীদ মিনারে এসে শেষ হয়।
সকাল সাড়ে এগারটায় অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। শরৎজ্যোতি চাকমার সভাপতিত্বে উক্ত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন। প্রধান আলোচক ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রাহমান নাসির উদ্দিন। সম্মানিত অতিথি ছিলেন কবি ও সাংবাদিক হাফিজ রশিদ খান। এছাড়া বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের তাপস হোড়, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক অশোক সাহা, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম-চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক জিংমুনলিয়ান বম প্রমুখ।
এরপর আদিবাসী শিল্পীদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন চট্টগ্রামস’ ভারতীয় দূতাবাসের সহকারী হাইকমিশনার অনিন্দ্য ব্যানার্জী। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উদ্বোধন করতে গিয়ে অনিন্দ্য ব্যানার্জী বলেন, জাতিসংঘ ঘোষিত আদিবাসী দিবসটি নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর অধিকার ও স্বার্থরক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীব্যাপী আদিবাসী জাতিসমূহের অস্তিত্ব ও অধিকারের অব্যাহত সংকট মোকাবিলা এবং স্বকীয় অস্তিত্ব সংরক্ষণ ও অধিকার আদায়ের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে প্রতিবছর এ দিবসটি নতুন বার্তা নিয়ে আসে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ৩ পার্বত্য জেলাসহ সমতলেও প্রচুর আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। এই উপমহাদেশে অনাদিকাল থেকে বনাঞ্চল রক্ষা ও প্রাকৃতিক সম্পদ সমৃদ্ধকরণে আদিবাসী জনগোষ্ঠী সব সময় গুরুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্ত তাদের জীবনমান উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষে পৌঁছাতে পারেনি। আমি মনে করি, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সার্বিক উন্নয়নে শিক্ষা অপরিহার্য। তাই তাদের সুশিক্ষিত করতে আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর আলাদা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। যা অত্রাঞ্চলের মানুষকে চিরকাল উজ্জীবিত করেছে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও আদিবাসীরা এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধারণ করে আসছে। আমরা চাই, আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের সকল অধিকার নিয়ে অন্যান্য নাগরিকদের মতো শান্তিপূর্ণ সহাবস’ানে বসবাস করুক।
আলোচনা সভার প্রধান অতিথি কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন বলেন, দেশে সংখ্যালঘুদের ভূমি বেদখল খুবই সহজ। কারণ, তারা নানাদিক থেকে দুর্বল। এই সুযোগটা আমরা বাঙালিরা নিচ্ছি। আর এভাবে আজকের পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের ভূমি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ১৯৪৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে আড়াই শতাংশ ছিল মুসলিম। বাকিরা আদিবাসী। আর আজ তা অর্ধেকে পরিণত হয়েছে। এমন অবস’ায় আদিবাসীরা আজ চরম অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। এদেশে অস্তিত্বের সংকটে রয়েছে ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগণও। আবুল মোমেন বলেন, আদিবাসীরা যে দেশান্তরিত হচ্ছে, তা উদ্বেগের বিষয়। শাসকগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রের বহুমাত্রিকতার বিষয়টি ভাবতে হবে।
অনুষ্ঠানের প্রধান আলোচক ড. রাহমান নাসির উদ্দিন বলেন, রাষ্ট্রকে উদারনৈতিক রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা করতে হবে। পাশাপাশি সংখ্যালঘু আর সংখ্যাগুরু না ভেবে জাতিবৈচিত্র্যকে ধারণ করে এগিয়ে যেতে না পারলে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।
অনুষ্ঠানের সম্মানিত অতিথি কবি হাফিজ রশিদ খান বলেন, পাহাড়ে অনেক রক্ত ঝরেছে। একটা পর্যায়ে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা যখন বুঝতে পারলেন, এই সমস্যার একটি সমাধান দরকার। তখনই শান্তিচুক্তি হয়েছে। কিন’ এই চুক্তিও বাস্তবায়িত না হওয়ায় আদিবাসীরা আজ দিশাহীন। এই অবস’া থেকে উত্তরণ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন হাফিজ রশিদ খান।