আত্মার পরিশুদ্ধতায় পরকাল-চিনত্মা

হাফেজ মুহাম্মদ আনিসুজ্জমান

আলস্নাহ্ পাক সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা সমসত্ম প্রশংসার প্রকৃত মালিক, যিনি আমাদেরকে তাঁর গুণগানের জন্য মুখের ভাষা দিয়েছেন। তাঁর পবিত্রতা, যিনি জাগতিক জীবনে অসংখ্য নেয়ামতে নিমজ্জিত রেখেও আখেরাতের কথা স্মরণ রাখতে আমাদের সহায়তা করেছেন। তাঁর কৃতজ্ঞতা, যিনি নশ্বর এ জীবনের সুখ-ঐশ্বর্য-সম্ভোগে রেখেও তাঁর স্মরণবিচ্যুত না হতে বারংবার বান্দাকে সর্তক করেছেন।
আলস্নাহ্্ এক, অদ্বিতীয়। তাঁর কোন শরীক নেই। তিনি ছাড়া আর কোন মা’বুদ নেই। তাঁর প্রভুত্বে কারো অংশীদারিত্ব নেই। আমাদের কল্যাণ ও মুক্তির পথপ্রদর্শক, আমাদের শাফাআতকারী সায়্যিদুনা হযরত মুহাম্মদ (সালস্নালস্নাহু আলাইহি ওয়া সালস্নাম) আলস্নাহ্্র বান্দা ও তাঁর শ্রেষ্ঠতম রাসূল।
আলস্নাহ প্রদত্ত জীবন বিধানে আখেরাতের মুক্তির লড়্গ্যেই দুনিয়াতে কাজ করে যাওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। আলস্নাহ ও রাসূলে বিশ্বাসী মানুষ মাত্রই পরকালে বিশ্বাস করে। একজন মুমিনের বিশ্বাসে এ উপলব্ধি অপরিহার্য যে, জাগতিক জীবনযাত্রা যেভাবেই চলুক, আখেরাত হওয়া চাই নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন সুখ-শানিত্ম সমৃদ্ধ। জীবন যতই দীর্ঘ হোক, তার শেষ আছে। সুখের উপকরণ যতই থাকুক, সেই সুখে আসবে ভাটা, মায়ের কোল ছেড়ে হামাগুড়ি দিয়ে যে মাটিতে পথচলা শুরম্ন, সেই মাটিতেই হবে আমাদের অনিত্মম শয্যা, এখানেই একদা আমরা হারিয়ে যাবই। শানিত্মতে হোক, শাসিত্মতে হোক সেই জীবনই হবে অননত্ম। আলস্নাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘প্রত্যেক প্রাণিই মৃত্যু আস্বাদনকারী, আর তোমরা কিয়ামতের দিন নিজ নিজ (কর্মের) প্রতিদান প্রাপ্ত হবে। আর যাকে দূরে রাখা হবে জাহান্নাম থেকে এবং প্রবেশ করানো হবে জান্নাতে, সে হবে কামিয়াব। আর দুনিয়ার জীবন তো ধোঁকার সামগ্রী বৈ কিছু নয়। ‘তোমরা নিজ নিজ ধনে-জনে অবশ্যই পরীড়্গিত হবে। আর তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী, যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল তাদের থেকে এবং মুশরিকদের নিকট থেকে নিশ্চয় শুনবে অনেক কষ্টদায়ক কথাবার্তা, যদি তোমরা ধৈর্য ধরো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, তবে সেটা হবে দৃঢ় চিত্ততার পরিচায়ক’। (সুরা আ-লে ইমরান : আয়াত ১৮৫-১৮৬)
জাগতিক জীবনে আমরা বৈধ যত কাজই করি না কেন, তাতে আমাদের লড়্গ্য থাকতে হবে পরকালের পুরস্কার। দুনিয়ার জীবনে ভাল-মন্দ যা-ই আমরা করে থাকি, তার প্রতিদান আমাদের পরকালেই গ্রহণ করতে হবে। তাই একজন মুমিনের প্রতিদানের লড়্গ্য থাকতে হবে আখেরাতে। অর্থাৎ পরকালের লড়্গ্যেই আমাদেরকে কাজ করে যেতে হবে। যে কাজে পরকালের প্রতিদানের কথা মনে রাখা হবে না, সে কাজের আবেদন এই দুনিয়া পর্যনত্ম। মসনভী শরীফে আরেফ বিলস্নাহ্্ আলস্নামা জালালউদ্দীন রূমী (রহ.) বর্ণনা করেছেন, ‘এক ব্যক্তি নিজের জন্য একটি বাড়ি নির্মাণ করলেন। সেখানে তিনি মসজিদের দিকে একটি জানালা রাখলেন। আরেক ব্যক্তি তার বাড়ি দেখতে আসলেন। জানালা দেখে তিনি বাড়ির মালিককে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এ জানালাটি কেন রাখলেন? তিনি জবাবে বললেন, ‘বাতাসের জন্য’। তখন প্রশ্নকারী ব্যক্তি তাকে বললেন, যদি আপনি এভাবে বলতেন যে, ‘আমি এ জানালাটি এজন্যই রেখেছি যে, মসজিদের আযানের শব্দ যেন স্পষ্টত শোনা যায়।’ তখন আপনার কথা আখেরাতের কথা হয়ে যেত। আর এ নিয়তের দ্বারা সওয়াব পেয়ে যেতেন। বাতাস তো আসতই। এ নিয়তের কথায় বাতাসও যেমন বন্ধ হতোনা, তেমনি সওয়াব পাওয়ারও এটা কারণ হয়ে যেত। আপনার এ কথায় বাতাস আসবে, কিন’ সওয়াব নয়।’ বস’ত যারা আখেরাতের কথা ভেবে সেই প্রতিদানের প্রত্যাশায় কাজ করে, তারা দুনিয়া-আখেরাত উভয়টি অর্জনে সড়্গম হয়। আমাদের প্রার্থনাও সেরূপ, ‘রাব্বানা আ-তিনা ফিদ দুনইয়া হাসানাতাও ওয়াফিল আ-খিরাতি হাসানাহ্্’।
মহান রাব্বুল আলামীনের ইরশাদ, ‘যে ব্যক্তি পরকালের ফসল কামনা করে, আমি তার জন্য সে ফসল বাড়িয়ে দেই। আর যে ব্যক্তি ইহকালের ফসল কামনা করে, আমি তাকে তার কিছু দেই। আর তার জন্য পরকালের কোন অংশ থাকবে না।’ (সুরা শু-রা-আয়াত : ২০) যারা দুনিয়ার জন্যই চায়, আখেরাতের কোন লড়্গ্য যাদের নাই, তাদের জন্য দুনিয়াতেই আলস্নাহ তাদের কাঙিড়্গত পার্থিব সম্পদের একাংশ দিয়ে থাকেন। তবে আখেরাতে তাদের কোন অংশ থাকবে না; কারণ সেটা তাদের কাছে প্রত্যাশিত নয়। আরও একটা বিষয় লড়্গ্যণীয় যে, আখেরাতের লড়্গ্যে এখানেই কাজ করতে হবে। কারণ, এ দুনিয়া কাজ করার, আখেরাতে বিশ্বাসী বান্দাদের সে ফসল উঠবে আখেরাতের গোলায়। আখেরাতে আমলের কোন সুযোগ নেই, বরং দুনিয়াই হলো ‘দারম্নল আমল’। দুনিয়াতে আমল করার কারণে দুনিয়া বিমুখ হয়ে আখের, আখের করা, আর জাগতিক সব করণীয় বর্জন করার নাম আখেরাতের ফসল বোনা নয়। ইসলামে বৈরাগ্য নেই। সংসার, সমাজ এবং ইত্যাকার সবকিছু করার মাঝে আখেরাতের ফসলের নিয়্যত রাখতে হবে। তবে সংসার-সমাজের কাজের মধ্যদিয়ে আখেরাতের ফসল বোনা হয়ে ওঠবে।
আলস্নাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে নবী, আপনি বলে দিন, যদি তোমরা আলস্নাহ্কে ভালবেসে থাকো তবে আমার আনুগত্য করো। তবে আলস্নাহ্্্ তোমাদেরকে ভালবাসবেন। তোমাদের গুনাহ্্ ড়্গমা করে দেবেন। আর আলস্নাহ্্ ড়্গমাশীল, দয়ালু।’ (৩:৩১) প্রিয় নবীর আনুগত্য অনুসরণের মাধ্যমেই আলস্নাহর প্রেম, ভালবাসা, তাঁর ড়্গমা ও দয়া লাভ করা যায়। নবীজি সংসার সমাজ সব করেছেন। নয়তো সেগুলোর যথাযথ নীতিমালা আমরা কোথায় পেতাম? আমাদের অবস’ানগত স্বরূপ হবে-হাত থাকবে কাজে, নিয়্যত ও অনত্মর থাকবে তাঁর সন’ষ্টির মাঝে। পার্থিব জীবনে নেহায়েত প্রয়োজনীয় ব্যয় সংকুলানের অতিরিক্ত অর্থ মানুষ ও মানবতার কাজে ব্যয় করলে আলস্নাহ আমাদের আখেরাতের ঠিকানা সুখ-শানিত্মর কানন-নিবাস জান্নাতেই বরাদ্দ করবেন। এ প্রসঙ্গে ইমাম গায্যালী (রহ.)
তাঁর মূল্যবান আধ্যাত্মিক পথ নির্দেশিকামূলক গ্রন’ কিমিয়ায়ে সাআদাত-এ এক হাদীস শরীফ উদ্ধৃত করেছেন। সায়্যিদুনা আবু সাঈদ খুদরী (রাদ্বিয়ালস্নাহু আনহু) বর্ণনা করেছেন, মিসরে মুহ্্তাসিব নামক অত্যনত্ম দানশীল একজন লোক ছিলেন। তার অভ্যাস ছিল, তিনি প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকাপয়সা গরীব, দুঃখী, অভাবী মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। একজন অভাবগ্রসত্ম লোকের ঘরে নবজাতক আসল। হতদরিদ্র লোকটির হাত শূন্য। বেচারা নিরম্নপায় হয়ে মুহতাসিব’র শরণাপন্ন হল। আর নিরম্নপায় হয়ে তাঁর কাছে সাহায্য চাইল। বলল, সনত্মানের দায়ে আমার সামান্য টাকা খুব দরকার। ওই সময় মুহ্্তাসিব’র কাছে একটি মাত্র দীনার ছাড়া দেবার মত কিছুই ছিল না। তিনি লোকটির হাত ধরে এক কবরস’ানে নিয়ে গেলেন। গিয়ে একটি নির্দিষ্ট কবরের পাশে দাঁড়ালেন আর বলতে লাগলেন, ‘হে কবরবাসী, আপনি একজন দানশীল লোক ছিলেন। সারা জীবন দান করেছেন, অভাবী মানুষদেরকে সাহায্য করতেন। আজ এ লোকটিরও কিছু টাকার বড় প্রয়োজন। তিনি আমার কাছে এসেছেন, অথচ আমার কাছে দেবার মত কিছু নেই। এটা বলে সেখান থেকে উঠে এলেন। এরপর নিজের পকেট থেকে একটি দীনার বের করলেন, এটার অর্ধেক তাকে দিয়ে বললেন, যত দিন না তোমার হাতে কোথাও থেকে কোন টাকা আসে, ততদিনের জন্য এটা আমি তোমাকে কর্জ দিলাম। ওই রাতে মুহ্্তাসিব ওই কবরবাসীকে স্বপ্নে দেখলেন। কবরবাসী তাকে বললেন, ‘আমার কবরের পাশে এসে আপনি যা বলেছেন, আমি সব শুনেছি। যান, আমার ছেলেদের বলুন, উনুনের পাশে মাটি খনন করতে। সেখানে পাঁচশত দীনার পুঁতে রাখা আছে। সেগুলো অভাবী লোকটিকে দিতে বলবেন। সকালে ওঠে তিনি তার ঘরে গিয়ে ওই জায়গা খুঁড়ে দেখতে বললেন। স্বপ্নে বাবার নির্দেশ জেনে তারা খুঁড়ে দেখতে রাজী হল। দেখল, সত্যিই সেখানে পাঁচশো দীনার আছে, যার কথা তারাও জানতো না। মুহতাসিব বললেন, ‘তোমরা দেখলে, আমার স্বপ্ন মিথ্যা নয়। এসব তোমাদের বাবার, তোমরা চাইলে বাবার কথামত সদকা করতে পার। চাইলে নিজেরাও রেখে দিতে পার’। তখন তারা সমস্বরে বলে ওঠলো, তা কী করে হয়? আমার বাবা মৃত্যুর পরও দান করছেন, আর আমরা তার সনত্মান হয়ে জীবদ্দশায় এমন কৃপণ হয়ে যাব যে গরীবের হকটাও দেব না। তারা ওই দীনারগুলো গরিব লোকটির হাতে তুলে দিল। তিনিও সে দীনার থেকে একটি দীনারের অর্ধেক নিয়ে মুহতাসিবের হাতে দিয়ে বললেন, ‘এটা আমার পাওনা, বাকী দীনারের কোন প্রয়োজন আমার নেই। এগুলো দীন দুঃখীদের দান করে দিন।’ বর্ণনাকারী বলেন, ‘জানি না, এঁদের মধ্যে কে বড় দানশীল।