আত্মজ

ইসলাম তরিক

গোধূলিলগ্ন। সূর্যের লালরশ্মি পুকুরের পানিতে স্নান করছে। পাখিরা ওড়ছে। প্রতিদিনের মতো আজও বটগাছকে ঘিরে অসংখ্য বাবুই পাখি চেঁচামেচি করছে। প্রতিদিন এই সময়টাতে বটগাছে বাবুই পাখিদের মেলা বসে। ওরা আনন্দ করে। গান গায়। আর মমতা বেগম তাদের গান শোনেন। মনের অজান্তে কখনও কখনও ওদের সঙ্গেই মৃদস্বরে গেয়ে ওঠেন রবীন্দ্রসংগীত। গুনগুন করে গান গায় আর তাদেরকে খাবার ছিটিয়ে দেন। পাখিরা ছাদে এসে খাবার খেয়ে আবার গাছে ওড়ে যায়।
কিন’ আজ সেদিকে কোনো দৃষ্টি নেই মমতা বেগমের। কলেজ থেকে ফিরেই প্রতিদিনের মতো আজও ছাদে বসেছেন পাখপাখালি আর প্রকৃতির রূপ দেখতে। কিন’ প্রচণ্ড বিষণ্নতায় ছেয়ে আছে তাঁর হৃদয়ের ক্যানভাস। জীবনের কিছু প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির হিসাব মিলাতে গিয়ে তিনি বারবার ব্যথিত হচ্ছেন। বিতৃষ্ণায় ভরে ওঠছে মন। শূন্যতার সেই বিষাক্ত ভাবনাটি ভাবতে ভাবতে মস্তিস্কের প্রতিটি কোষও আজ ক্লান্ত। থোমকে দাঁড়িয়েছে চেতনার উত্তাল নদী। জমাটস্তব্ধ ইউরেনিয়ামের মতো স’বির ও ভারি হয়ে আছে মমতা বেগমের মন। কাউকে দোষারূপ করারও কিছু নেই। কারণ, ভুলটা যে তাঁর নিজেরই।
মমতা বেগম অসম্ভব প্রকৃতিপ্রেমী এক সৌখিন মহিলা। সবুজে ঘেরা বনবনানী আর পাখির কলতানে খুঁজে ফিরেন জীবনের রঙ। নিজের সম্পদে গড়া এই বাড়িটা তাঁর এক একটি স্বপ্নের প্রতিফলন। এই বাড়িতে এলে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে সবাই মুগ্ধ হবেন। এক একর জমির মাঝে, উত্তর দিকটাতে চাররুম বিশিষ্ট একতলা পাকাবাড়ি মমতা বেগমের। দক্ষিণে একটি পুকুর। পুকুরের পাড়ে রয়েছে বেশকিছু ফলদ ও ঔষধি গাছ। পূর্ব ও পশ্চিমে রয়েছে সবজি ও ফুলের বাগান।
সবমিলিয়ে চমৎকার একটি বাড়ি। অনেক পরিকল্পনা করে বাড়িটি করেছিলেন তিনি।
মমতা বেগম আনমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। এমন সময় স্বামী সাব্বির আহমেদ ছাদে এলেন। চেয়ার টেনে মমতা বেগমের পাশে বসলেন। কিছুক্ষণ নীরব থেকে মমতা বেগমের দিকে চেয়ে বললেন,
– বেশ কয়েক দিন থেকে তুমি কী যেন ভাবছো? মুখটা সব সময় মলিন দেখায়। তোমার কী হয়েছে বলত?
– কী আর হবে? সমস্যা তো ঐ একাটায়।
– কোন সমস্যার কথা বলছো?
– কেন তুমি জানো না?
– বাচ্চার কথা বলছো?
– হুম…।
– সেটাতো সৃষ্টিকর্তার দান।
– সৃষ্টিকর্তাকে কেন দোষারূপ করছো? তিনি তো দিয়েছিলেন। কিন’…..
দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে দুজনেই কী যেন ভাবতে লাগলেন। চারিদিক থেকে মাগরিবের আজান ভেসে আসছে। বাবুই পাখিদের চেঁচামেচি আরও বেড়ে গেছে। দূরের পাখিগুলোও ঘরে ফেরা শুরু করেছে। পুকুরের পানি থেকে লাল সূর্যরশ্মিও বিদায় নিয়েছে। আজান শেষে মমতা বেগম নীরবতা ভেঙ্গে বললেন,
– আচ্ছা, আমরা মরা যাওয়ার পর আমাদের নাম নেওয়ার মতো কেউ কি দুনিয়াতে থাকবে?
– না।
– এটা ভাবলে তোমার খারাপ লাগে না?
– লাগে কিন’ কিছু কি করার আছে?
– আচ্ছা এই সম্পদগুলো আমরা রেখে যাব, সেটা কার জন্য বলতে পারো?
সাব্বির আহমেদ এবার রেগে গেলেন। কিছু একটা বলতে গিয়ে আবার থেমে গেলেন। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বললেন,
মমতা তোমার প্রশ্নের কোনো উত্তর আমার জানা নেই, সেটা তুমি ভালো করেই জানো। তারপরেও কেনো বারবার এই প্রশ্নগুলো করে আমাকে আহত করো?
মমতা বেগম কথা আর বাড়ালেন না । সাব্বির আহমেদ ছাদ থেকে নেমে গেলেন। মমতা বেগম বারবার নিজেকে তিরস্কার করলেন। কেনো যে ১৭ বছর আগে সেই ভুলটা তিনি করেছিলেন?
আজ থেকে ১৭ বছর আগে সাব্বির আহমেদকে বিয়ে করেন মমতা বেগম। মমতা বেগম সাব্বির আহমেদের দ্বিতীয় স্ত্রী। ২৬ তম বিসিএস দিয়ে তিনি লেকচারার হিসেবে কলেজে ঢুকেছিলেন। চাকরির সুবাদেই সব্বির আহমেদের সঙ্গে তাঁর পরিচয়। একই ডিপার্টমেন্টে তাঁরা চাকরি করতেন।
ভালো লাগা থেকে ভালোবাসার জন্ম হয় মমতা বেগমের মনে। দিন যায় মমতা বেগমের ভালোবাসার বাড়তে থাকে। একসময় সাব্বির আহমেদকে তিনি মনমন্দিরে ঈশ্বেরের আসনে বসিয়ে পূজা করতে লাগলেন। কিন’ যেদিন বিষয়টি সাব্বির আহমেদ বুঝতে পারলেন, সেদিন তিনি সবকিছু মমতা বেগমকে খুলে বললেন। সাব্বির আহমেদের বিয়ে ঠিক করা আছে। মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল মমতা বেগমের। কিন’ যাকে একবার ভালোবাসা যায় তাকে আর ভোলা যায়? মমতা বেগমের বেলাতেও তাই ঘটল। সাব্বির আহমেদের সঙ্গে আমেনা বেগমের বিয়ে হয়ে গেল। তবুও সাব্বির আহমেদকে ভুলতে পারলেন না মমতা বেগম। প্রায় দুবছর ধরে সাব্বির আহমেদকে তিনি ভুলতে চেষ্টা করেছেন। কিন’ ভুলতে পারেননি। সাব্বির আহমেদের সঙ্গে যেন তাঁর জন্ম-জন্মান্তরের প্রেম। শেষ পর্যন্ত মমতা বেগম সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি সাব্বির আহমেদকেই বিয়ে করবেন। সতীনের ঘর করতে পারবেন, কিন’ সাব্বিরকে ছাড়া অন্যের ঘর তিনি করতে পারবেন না। কিন’ সাব্বিরের ১ম স্ত্রী আমেনা বেগম কি এ বিয়েতে রাজি হবেন? নারীরা এই পৃথিবীতে সবকিছু বিলিয়ে দিলেও স্বামীর ভাগটি অন্যকে দিতে নারাজ। তাদের মন অনেক ক্ষেত্রে উদার হলেও এক্ষেত্রে খুব সংকীর্ণ। আমেনা বেগমের ক্ষেত্রেও তাই হলো। তিনি কিছুতেই এই বিয়েতে রাজি নন। কিন’ মমতা বেগমের বাঁচা-মরা সমস্যায় একটি শর্তে রাজি হলেন আমেনা বেগম। মমতা বেগম কোনো দিন মা হতে পারবে না। মমতা বেগমের ডিম্বনাড়ি অপারেশন করে কেটে ফেলতে হবে। তাতেই রাজি হলেন মমতা বেগম। বিষয়টি তাঁরা তিনজন ছাড়া আর কেউ জানেন না।

বিয়ের পর সতীনের বাচ্চাকেই মমতা বেগম নিজের করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। কিন’ ভাগ্যের কি পরিহাস! নিজের সন্তানের সুখ আর আভিজাত্যের কথা ভেবে আমেনা বেগম নির্মম একটি শর্ত দিয়ে অন্যের ক্ষতি করতে চাইলেও ক্ষতির সম্মুখীন হলেন নিজেও। ১৭ বছর ধরে শতচেষ্টা করে আমেনা বেগমেরও বাচ্চা হচ্ছে না। পাড়াপড়শিরা, আত্মীয়-স্বজন সবাই তিরস্কার করে। খুব খারাপ লাগে তাঁদের। সন্তান ছাড়া হৃদয়টা খাঁখাঁ করে। বাড়ি-ঘরও শূন্য মনে হয়। দুটো বাড়িজুড়ে একটি সন্তানও নেই। না পাওয়ার বিষাক্ত থাবায় জর্জরিত তিনটি প্রাণ। আমেনা বেগমও আজকাল নিজেকে তিরস্কার করেন। তাঁর নির্মম শর্তের জন্য। সাব্বির আহমেদের মুখে কোনো ভাষা নেই। তিনি কাউকেই কিছু বলতে পারেন না। নীরবে সবকিছু সহ্য করে যান।

চারিদিকে থেকে ইশার আজান ভেসে এলো। মমতা বেগম তবুও ছাদ থেকে নামছেন না। সাব্বির আহমেদ আবার ছাদে উঠলেন। পেছন থেকে মমতা বেগমের কাঁধে হাত রাখলেন। সাব্বির আহমেদের হাত ধরে মমতা বেগম হুহু করে কেঁদে ওঠলেন। সাব্বির আহমেদ বাধা দিলেন না।
কি বলে শান্ত্বনা দেবেন তিনি? তাঁরও যে কোনো ভাষা জানা নেই।