আট শিল্পীর যৌথ চিত্রপ্রদর্শনী

রং ও রেখার বৈভব ছড়ানো বর্ণিল ক্যানভাস

আজিজুল কদির
Pic 04

শিল্পকলায় জয়নুল গ্যালারীতে প্রদর্শনী কড়্গের দেয়ালজুড়ে ঝুলছে রং ও রেখার বৈভব ছড়ানো অনেকগুলো ক্যানভাস। সেসব চিত্রপটে উঠে এসেছে বহুমাত্রিক বিষয়। চিত্রিত হয়েছে নিসর্গের আখ্যান, নারীর সৌন্দর্য কিংবা যাপিত জীবনচিত্র। শিল্পরসিকের নয়নজুড়ানো ছবিগুলো এঁকেছেন ৮ জন চিত্রশিল্পী। বিশেষ এক বৈশিষ্ট্যে এই চিত্রকররা মিলে গেছেন সমানত্মরাল রেখায়। তারা সবাই এক সময়ের চট্টগ্রাম চারম্নকলা কলেজের শিড়্গার্থী। গত ১১-১৫মে জেলা শিল্পকলা একাডেমীর জয়নুল গ্যালারীতে পাচঁদিন ব্যাপী উক্ত প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়।
যাদের শিল্পকর্ম নিয়ে উক্ত প্রদর্শনী তারা হলেন যথাক্রমে শিল্পী মিহির মলিস্নক, শিল্পী মহিউদ্দিন আহমেদ, শিল্পী বিশ্বনাথ দাশ, শিল্পী আবেশ কুমার ইন্দু , শিল্পী ওসমান পাশা ,শিল্পী উত্তম কুমার তালুকদার, শিল্পী পিসি রম্নবেল, শিল্পী অরম্নণ কুমার শীল।
চারপাশের প্রকৃতি, পরিবেশ ও সমাজ নিয়েই যেমন আমাদের জীবনপ্রবাহ। তেমনি শিল্পীর যাপিত জীবনের ভ্রমণ অভিজ্ঞতার সঙ্গে সংবেদনশীল নানা অনুষঙ্গের যোগে আট শিল্পীর চিত্রপট হয়ে ওঠেছে বাঙ্ময়, সজীব ও সুন্দর। সমাজ বাসত্মবতার কঠিন কিছু দিকও উন্মোচিত হয় কোনো কোনো শিল্পীর প্রকাশে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের চলমান শিল্পার্চ্চার একটা অবয়ব আমরা পেয়ে যাই আট শিল্পীর উক্ত প্রদর্শনীতে।
এই দলীয় আয়োজনে আটজনের ২৮টি শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে। এতে শিল্পীদের একেক জনের অঙ্কন-ধরন লোকজ ও আধুনিকতায় মূর্ত বিমূর্ততায় প্রতিস’াপিত। বাংলার আকাশ ও নিসর্গের বর্ণ আলিম্পনের ওপর জ্যামিতিক ফর্ম ও রেখার পরিমিত সমাবেশ ঘটেছে শিল্পীদের প্রতিটি চিত্রপটে। কখনো বিষয়ভিত্তিক ছবির সঙ্গে শিল্পীদের রং-তুলির আঁচড়ে উদ্ভাসিত হয়েছে বিমূর্ত ছবিও। তেমনি শিল্পী মহিউদ্দিন আহমেদের চিত্রপটে ঠাঁই করে নিয়েছে জলরঙের ওয়াশের মধ্যে নিসর্গ অর্থাৎ সবুজ শ্যামলিমা। ‘মন যা চাই আঁিক’ সিরিজের চিত্রকর্মে তাই বাংলার প্রকৃতিকে উপজীব্য করেই যেন তার চিত্র রচনা।
অন্যদিকে শিল্পী বিশ্বনাথ দাশ ‘লাইফ সামারি’ শিরোনামের শিল্পকর্মে দেখা যায় বর্তমান সময় বাসত্মবতার নিরিখে নির্বাচিত হয়েছে প্রদর্শিতব্য চিত্রকর্মগুলো। যেখানে ক্যানভাসে ধরা পড়েছে বহমান সময়ের ভাষা, বিচিত্র রূপে। ফলে আপন মনে গড়ে তোলা স্বপ্নপুরির শৈল্পিক রূপ মন কেড়ে নেয় তার চিত্রকর্মে।
অন্যদিকে শিল্পী ওসমান পাশার ক্যানভাসে দেখা যায় সময়কে তুলে ধরার নিদারম্নণ চেষ্টা। সেই সাথে রেখার গুরম্নত্ব পেয়েছে বিষয় বৈচিত্র্যে সময়ের আলিঙ্গনে। ছবির বিষয়, রঙের ব্যবহার এবং শিল্পীর চিনত্মার গভীরতা দর্শককে বেশ টেনেছে বলা যায়। আবার সীমিত রঙের ব্যবহারে ছবিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে শিল্পী আবেশ কুমার ইন্দুর শিল্পকর্মে। শিল্পী ইন্দু রং রেখার আলো-ছায়া দিয়ে যেন জীবনের অবয়ব তুলে ধরতে চেয়েছেন সবুজ পাতার ব্যবচ্ছেদে। আবার পাহাড়ের অনুভূতিগুলো শিল্পের ফ্রেমে উপস’াপনের প্রয়াস চালান শিল্পী মিহির মলিস্নক। পাহাড়ের তেজোদীপ্ত সংগ্রাম, যুগানত্মরের চেতনা, বঞ্চিত ইতিহাস এবং প্রতিরোধের বার্তা উঠে এসেছে শিল্পীর তুলিতে ‘পিসফুল হিল ট্রেক্টস’ শিরোনামে।
অন্যদিকে শিল্পের প্রতি নিখাদ দরদ, বিশ্বাস এবং মনোযোগ হয়ে উঠে এসেছে শিল্পী উত্তম কুমার তালুকদার এর ‘ ড্রিম অব লাভ’ শিরোনামে চিত্রে। নিখুঁত একটা প্রচেষ্টায় চেতনালব্ধ বুনন ফুটে উঠেছে তার কাজে। শিল্পচর্চায় শিল্পী উত্তম এর হাতিয়ার বল পয়েন্ট। তার যথাযথ প্রয়োগ ঘটিয়েছে শিল্পী তার চিত্রপটে, শিল্পভাবনায় এমনকি তার দৈনন্দিন জীবনাচরণেও। শিল্পী অরম্নণ কুমার শীল এর চিত্রপটে বিষয়বস’র আয়োজনটা ভালো।
রঙের ব্যবহারে ব্রাশিং এর টানে যেন মানবিকতা, সাংস্কৃতিক চৈতন্য, সামাজিক মূল্যবোধের মানসপট ফুটিয়ে তোলার নিদারম্নণ চেষ্টা ‘প্রকৃতি’ শিরোনামের শিল্পকর্মে । আবার শিল্পী পিসি রম্নবেল এর পেপারে মিশ্র মাধ্যমে করা শিল্পকর্মগুলো জলের তলায় থাকা মাছের অভয়ারণ্যের মাঝে হয়তো তিনি খুঁজে ফিরেছেন সমাজের নৈরাজ্যের। যা বহুরৈখিক ভাবনায় আপোসহীন একটা সময়কে দাবি করছে।
সব শেষে বলা যায়, চর্চায় নিবদ্ধ থেকে আট শিল্পীর এই দুর্বার আয়োজন চলতে থাকুক সৃষ্টি সুখের উলস্নাসে এই আশা নিশ্চয় নিরর্থক নয়।