আটকে আছে ‘সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স’

মোহাম্মদ আলী
muslim-hall-institute-helal-(5)

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমোদনের পরও আলোর মুখ দেখছে না বহুল আলোচিত চট্টগ্রামে ‘সাংস্কৃতিক বলয়’ বা ‘কালচারাল কমপ্লেক্স’ নির্মাণ প্রকল্প। ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নগরীর শহীদ মিনার, মুসলিম হল, পাবলিক লাইব্রেরি ও থিয়েটার ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রামকে ঘিরে সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে ওঠার প্রকল্পের অনুমোদন দুই বছর ধরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেকে) আটকে আছে। নকশা সম্পন্ন হওয়ার পরও শুধুমাত্র চট্টগ্রামের রাজনৈতিক নেতাদের সদিচ্ছা ও তদারকির অভাবে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন হচ্ছে না বলে মনে করেন নগরীর অধিকাংশ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।
২০১৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর তীর্যক নাট্যদলের ৪ দিনব্যাপী নাট্যমেলায় প্রথমবার সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর মুসলিম ইনস্টিটিউট ভেঙে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স তৈরি করার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের কথা জানান।
এর আগে একই বছরের ৬ মে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ও প্রয়াত সংস্কৃতি সচিব রণজিৎ কুমার বিশ্বাস মুসলিম হল পরিদর্শনে এসেছিলেন। সে সময় মন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে ইনস্টিটিউটের সদস্য ও নগরের সংস্কৃতিকর্মীদের অনুষ্ঠিত সভায় এই হলের মিলনায়তনের আর্থিক ও অবকাঠামোগত সমস্যাগুলো নিয়ে আলাপ হয়। সব শুনে সংস্কৃতিমন্ত্রী মুসলিম হল ভেঙে একটি কালচারাল কমপ্লেক্স করার পরিকল্পনা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করবেন বলে জানিয়েছিলেন।
এরপর ২০১৫ সালের ২১ জানুয়ারি স্থাপত্য অধিদপ্তর থেকে একটি প্রতিনিধি দল চট্টগ্রাম আসেন। তারা মুসলিম ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম গণগ্রন্থাগার, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, থিয়েটার ইনস্টিটিউট, মসজিদসহ সব মিলে প্রায় ১ দশমিক ৮৭ একর জায়গার একটি ডিজিটাল সার্ভে করেন। হল, মার্কেটের সাইট, শহীদ মিনার, সব মিলে সার্ভের পর স্থাপত্য অধিদপ্তর এটার নকশা প্রণয়ন করে। এরপর বিভিন্ন সময় মন্ত্রণালয়ের স্থপতি ও প্রকৌশলীরা শহীদ মিনার এলাকা একাধিকবার ঘুরে গেছেন। তারপরও এই প্রজেক্ট কেন আলোর মুখ দেখছে না তা এখন সর্বস্তরের সংস্কৃতিকর্মীদের প্রশ্ন।
জানা গেছে, মন্ত্রণালয়ের স্থপতি আসিফ ‘সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স’ ডিজাইনের কাজ করেছেন। সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্সে একটি বড় অডিটোরিয়াম, একটি ছোট অডিটোরিয়াম, সেমিনারকক্ষ, গ্যালারি, কফি কর্নার থাকবে। রাস্তাটা যেমন আছে তেমনই থাকবে। ওপরের রাস্তা শহীদ মিনার পর্যন্ত যাবে। ওপর দিয়ে মানুষ হাঁটাচলার জন্য একটি রাস্তা যাবে। শহীদ মিনার একটু স্থানান্তরিত হতে পারে।’
সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্সের পূর্ণাঙ্গ প্রজেক্ট তৈরি হওয়ার পরও কেন তা আটকে আছে তা জানেন না বলে উল্লেখ করেন থিয়েটার ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রামের পরিচালক নাট্যজন আহমেদ ইকবাল হায়দার। তিনি গত শুক্রবার সুপ্রভাত বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমার সাথে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের কথা হয়েছে। তিনি বলেছেন, ‘১০০ কোটি টাকার প্রকল্প একনেকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের কাজ শেষ। এখন আপনাদের নেতারা যদি প্রেসার দেন তাহলে কাজটা এগিয়ে যাবে।’
ইকবাল হায়দার বলেন, ‘প্রকল্পটি একনেকে পাশ হওয়ার জন্য চট্টগ্রামের নেতাদের প্রেসার দিতে হবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। আমাদের পক্ষে চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। দেড় বছর আগে প্রকল্পটি একনেকে জমা হয়েছে। আর এগুচ্ছে না কেন তা আমাদের প্রশ্ন। ফ্লাইওভার হচ্ছে। কিন্তু এটা হচ্ছে না কেন? এখানেও সমন্বয়ের অভাব আছে। আমাদের প্রশ্ন এটা কি হবে না? নেতারা এব্যাপারে খবর নিতে পারেন। এখানে সাংসদদের ভূমিকা থাকা উচিত। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে নেতাদের কোনো ভূমিকা আমরা দেখি না।
এ ব্যাপারে প্রবীণ নাট্যজন প্রদীপ দেওয়ানজী সুপ্রভাত বাংলাদেশকে বলেন, ‘সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্সের কথা আমরা অনেক দিন ধরে শুনে আসছি। আর কত দিন, কত বছর শুনতে হবে জানি না। আমরা অপেক্ষায় আছি। কিন্তু কাজ শুরু হওয়ার কোন আলামত আমরা দেখতে পাচ্ছি না। তবে শিগগিরই সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রকল্প একনেকে পাশ হবে জানিয়েছেন কোতোয়ালী আসনের সংসদ সদস্য জিয়া উদ্দিন বাবলু। তিনি গত শনিবার রাতে সুপ্রভাতকে টেলিফোনে বলেন, ‘সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের সাথে আমার কথা হয়েছে। শিগগিরই প্রকল্পটি একনেকে পাশ হবে। আর চলতি অর্থবছরের (২০১৭-২০১৮) মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে।’
উল্লেখ্য, ১৯৬৯ সালের সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ ও সর্বস্তরের সংস্কৃতিকর্মীদের দাবি ছিল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারকে পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স হিসেবে গড়ে তোলার। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে চট্টগ্রামের সাবেক ও বর্তমান মেয়র এবং সরকারি নেতারা তাদের বক্তব্যে শহীদ মিনার, মুসলিম হল ও থিয়েটার ইনস্টিটিউট, চট্টগ্রাম এলাকায় সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে ওঠার প্রস্তাব সম্পর্কে উল্লেখ করেছিলেন।