আজ সারারাত রবীন্দ্রনাথ

উৎপলকান্তি বড়-য়া

মা, আমার রিভাইজ দেয়া শেষ। কিছু বলবে মা। দরজায়, মা কড়া নাড়ছে মনে করে মুমু মায়ের উদ্দেশ্যে কথাগুলো বললো।
টক টক টক। দরজায় আবারও কড়া নাড়ার শব্দ।
দরজা খোলো মুমু। পুরুষের কণ্ঠ।
কে? মা তো নয়। বাবাও তো নেই। শহরে। বৃহস্পতিবার আসবে। বাবার কণ্ঠও না। তাহলে কে দরজার কড়া নাড়লো? কথা বললো? মুমু দরজার দিকে এগিয়ে যায়। তৃতীয় শ্রেণি বয়সের মুমুকে বেশ সাহসীই বলা যায়। মুমু বরাবরই স্মার্ট। তার বয়েসী যে কারোরই চেয়ে মুমু সাহসী, বুদ্ধিমতি, চালাক ও মেধাবী। দরজা খোলে মুমু।
একি! কে আপনি? কী চাই! কাকে চাই?
আগে ভেতরে তো আসতে দাও, তারপর তোমার সাথে কথা বলি। বলতে বলতে বুড়ো লোকটা মুমুর গা ঘেঁষে ঘরে ঢুকে যায়। মুমুর শোয়ার ঘরে খাটের পাশে পড়ার টেবিলের সাথে রাখা প্রাইভেট স্যারের চেয়ারে এসে বসে পড়ে বুড়ো লোকটা। সাদা পাঞ্জাবি ও ধুতি পরা মুখ ভর্তি সাদা লম্বা দাড়ি বুড়ো লোকটার। কাঁধে হালকা কাপড়ের সাদা লম্বা ভাঁজ করা চাদর ঝোলানো।
আচ্ছা, আপনাকে তো খুব চেনা মনে হচ্ছে। কে আপনি? কোথায় যেন দেখেছি। মনে করতে পারছি না।
চিনবে, চিনবে। আমাকে চিনবে। আমাকে সবাই চেনে? তোমার বাবা, মা, ঠাকুরদা, ঠাকুরদি, কাকা, কাকি সবাই চেনে আমাকে। আমি যে সবার পরিচিত। সবার মুখে মুখে আমার নাম। কেনো, তুমি তো আমারই লেখা কবিতা পড়ছিলে সন্ধ্যা থেকে এতক্ষণ পর্যন্ত। কাল তোমার পরীক্ষা। পড়ছিলে ‘তালগাছ’ কবিতাটা। দেখো না চেষ্টা করে চিনতে পারো কিনা? চমৎকার শান্ত কোমল কণ্ঠে একটানা কথাগুলো বলে থামলো বুড়ো লোকটা।
মুমু চিনতে পেরে হঠাৎ চমকে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর! আমার ঘরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর! মুমু যেনো আকাশ থেকে পড়লো এবার।
আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর!
হ্যাঁ। তুমি এবার ঠিক চিনতে পেরেছো।
খানিকটা থমকে গিয়ে মুমু বললো,
কিন’ আপনি তো মরে গেছেন! আপনি তো বেঁচে নেই।
হ্যাঁ। তুমি ঠিক বলেছো, আমি মরে গেছি। তবু আমি সব সময় আছি তোমাদের সাথে, তোমাদের চারপাশে সকলের সাথে, সবসময়। এই তো, একটু আগে তুমি মামনির সাথে আমার কথা বলছিলে। বলছিলে, যিনি কবিতাটি লিখেছেন তিনি কী যে বোকা! তালগাছের কী পা থাকে? তালগাছ যে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে বলেছেন! তালগাছের তো চোখই নেই। তাহলে আকাশে কীভাবে উঁকি মারবে? মামনির কাছে আরো জানতে চেয়েছিলে, তালগাছের কী আমাদের মতো থাকার বাসা আছে নাকি, যে তার বাসা ফেলে যাওয়ার কথা বলছে?
হ্যাঁ, বলেছিলাম তো। কিন’ আপনি কীভাবে জানেন এসব? আমি তো মামনিকে বলেছি!
আমি জানি। সব জানি। আমার কবিতা তুমি, তোমরা পড়ছো পাঠ করছো, আমি জানবো না! যারা আমার কবিতা পাঠ করে তাদের সবাইকে আমি জানি-চিনি।
আমি জানতাম না, তাই মামনির কাছে জানতে চেয়েছি।
হ্যাঁ জানি তো। মামনি তোমাকে তালগাছের এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকার কথা বুঝিয়ে দিয়েছেন। তালগাছের চোখের কথা বুঝিয়ে দিয়েছেন। সব জানি আমি। শোনো মুমু, তুমি আরো যখন বড় হবে তখন আরো অনেক কিছু জানতে পারবে।
কিন’ আপনি আমার কাছে কেন এলেন, বলেন নি তো!
ও, হ্যাঁ ঠিক বলেছো তুমি। বলছি, কেন তোমার কাছে এত রাতে এলাম। আজ তুমি আমাকে বেশ স্মরণ করেছো, আমার লেখা ‘তালগাছ’ কবিতাটা পড়তে গিয়ে, শিখতে গিয়ে। মামনিকে নানান প্রশ্ন করেছো, সেতো আগেই বলেছি। ভাবলাম, তোমার মতো তোমার বয়েসী অনেকেই এ রকম করে ভাবে না, প্রশ্ন করে না। তোমার এ রকম চিন্তা, প্রশ্নগুলো করতে দেখে তোমাকে ভালো লেগেছে আমার। দেখার ইচ্ছে হলো তোমাকে। তো চিন্তা করলাম তোমার সাথে একবার দেখা করেই যাই। আমার আবার সময় নেই। জানো তো, রাত পোহালেই আজ পঁচিশে বৈশাখ। আমার জন্মদিন। আমার অনেক কাজ। আমাকে নিয়ে সারাদেশে অনেক আয়োজন।
-আপনার লেখা জাতীয় সংগীত আমরা প্রতিদিন স্কুলে গেয়ে থাকি তো! মুমু বেশ আগ্রহভরে বললো কথাটা।
-বাহ। বেশ বেশ। আমি জানি। তোমরা আমার লেখা গানকে জাতীয় সংগীত হিসেবে সম্মান দিয়েছো। আমি অনেক খুশি। অনেক সম্মানবোধ করি। আমি যাই এবার। আমার তো আজ অনেক কাজ। তুমি পড়ো লেখো, মনোযোগ সহকারে। অনেক বড় হও। ভালো থেকো। তোমাদের মাঝেই আমি আছি, থাকবো চিরদিন-বলতে বলতে রবীন্দ্রনাথ দরজার দিকে এগিয়ে যান।
-কিন’ আমার কথা যে -মুমুর কথা শেষ হওয়ার আগেই তিনি দরজা ফাঁক করে বেরিয়ে যান। মুমু তবুও দরজার দিকে এগিয়ে যায় দ্রুত। বলতে থাকে -শুনুন! শুনুন! আমি একটা কথা-।
মা মুমুকে গা ধরে ঝাঁকি দিয়ে বলেন, কি হলো মামনি! কী আবোল তাবোল বলছিস! কাকে কী শুনতে বলছিস? স্বপ্ন-টপ্ন দেখছিস হয়তো। ওঠ। পরীক্ষা না আজ তোর। সময় অনেক হয়ে গেছে। উঠে ফ্রেশ হয়ে নে। নাস্তা করে আরেকটু পড়তে বোস। বাংলা পরীক্ষাতো আজ। আর একবার রিভাইজ দে।
ধরফর করে মুমু শোয়া থেকে উঠে বসে। মনে মনে ভাবছে,
-আমি কি তাহলে স্বপ্ন দেখছিলাম? ইস স্বপ্নটা ভালো ছিল। রবীন্দ্রনাথ স্বপ্নে এসেছে। আমার কাছে। আমাদের রবীন্দ্রনাথ। সারারাত আমার সাথে ছিলেন। স্বপ্নে। মনে মনে বলতে বলতে মুমুর অজান্তেই জানলা দিয়ে ভোরের নতুন সূর্যের কচি সোনালী রোদের হাসির রেখা ছড়িয়ে পড়ে তার সারা চোখে মুখে।