আজ ফাগুনের প্রথমদিন

স্বপ্নে ও জাগরণে বসন্ত দেয় দোলা

আজিজুল কদির
Boshontho(Spring)_Polash-Fu

ঋতুচক্র যেন এখন আর পঞ্জিকার অনুশাসন মানছে না। কুয়াশার চাদরমোড়া শীত তার তীব্রতা ছড়াতে না ছড়াতেই যেন বিদায় নিল। ঋতু পরিক্রমায় প্রকৃতির দিকে তাকালে শীত ও বর্ষার মত বসন্তকেও চেনা যায় অনায়সে। বাঙালির ঋতুভিত্তিক উৎসবের ঋতুরাজ হলো বসন্ত। ষড়ঋতুর দেশে বসন্ত হচ্ছে যৌবনের প্রতিরূপ।
‘বসন্তে ফুল গাথঁলো আমার জয়ের মালা, বইলো প্রাণে দখিন হাওয়া- আগুন-জ্বালা’ এমন মধুর লগনে প্রকৃতি আর প্রাণের আপন উচ্ছ্বাস উৎসবের রঙে-ঢঙে-মদিরায় মেতে ওঠে। অদ্ভুত এক শিহরণ জাগে আজ। মনে তো বটেই। সেই সঙ্গে বনেও।
দখিনা হাওয়া, ঝরা পাতার নুপুরের নিক্কন, প্রকৃতির মিলন এসব জানান দিচ্ছে বসন্ত এসে গেছে। বসন্ত মানেই পূর্ণতা। বসন্ত মানেই নতুন

প্রাণের কলরব। বসন্ত মানেই একে অপরের হাত ধরে হাঁটা।
এ ঋতু বাসন্তী রঙে সাজায় মনকে, করে আনমনা। শীতের জীর্ণতা সরিয়ে ফুলে ফুলে সেজে ওঠে প্রকৃতি। গাছে গাছে নতুন পাতা, স্নিগ্ধ সবুজ কচি পাতার ধীর গতিতে বাতাসের সঙ্গে বয়ে চলা জানান দেয় নতুন কিছুর।
শীতের খোলসে ঢুকে থাকা বন-বনানী মোহনীয় স্পর্শে জেগে ওঠে। পলাশ, শিমুল গাছে লাগে আগুন রঙের খেলা। প্রকৃতিতে চলে মধুর বসন্তে সাজ সাজ রব। আর এ সাজে মন রাঙিয়ে গুনগুন করে অনেকেই গেয়ে ওঠে- ‘মনেতে ফাগুন এলো..’।
প্রতিবছর নিয়ম করেই ঋতুরাজ বসন্ত ফাল্গুন আর চৈত্রকে নিয়ে এসে উঁকি দেয় ষড়ঋতুর ঘরে, ফাল্গুনের প্রথম প্রহর থেকেই শুরু হয় তার আগমন। শীতের শেষ তথা মাঘের মাঝামাঝি থেকেই প্রকৃতিতে বইতে থাকে বসন্তের আগমনী হাওয়া, এ যেন জানান দেয়া আমি ঋতুরাজ, আমি বসন্ত, আমি আসছি।
হিমেল হাওয়া অথচ তপ্ত নয়, আবার তপ্ত বাতাস অথচ হিমেলও নয়, এ এক অপূর্ব অনুভুতির হাওয়া প্রকৃতিতে বয়ে চলে পুরো বসন্ত জুড়ে।
আর তাইতো বসন্ত নিয়ে রচিত হয়েছে অজস্র গান, কবিতা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বসন্তের খোলা হাওয়ায় মন মাতিয়ে কখনো গেয়েছেন ‘আহা আজি এ বসন্তে এত ফুল ফোটে, এত বাঁশি বাজে, এত পাখি গায়, আহা আজি এ বসন্তে’ আবার কখনো স্বপ্নবিভোর হয়ে রচনা করেছেন ‘আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে, তব অবগুণ্ঠিত কুণ্ঠিত জীবনে করো না বিড়ম্বিত তারে’। কবি সুভাস মূখোপাধ্যায় বসন্তের আগমনীতে যেন অনুরাগ নিয়েই লিখেছেন ‘ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক, আজ বসন্ত” কখনো বসন্তে আপ্লুত ভালোবাসায় কেউ যেন গেয়ে ওঠে ‘তুমি এলে বসন্ত আসে বনে দোলা লাগে বিরহী এ প্রানে ।’
ঋতুরাজ বসন্তকে নিয়ে তাইতো ভালোবাসার কমতি নেই, ফাল্গুনের প্রথম প্রহরে শহুরে মানুষগুলো নাচে গানে মুখরিত করে বরণ করে নেবে বসন্তকে। পহেলা ফাগুনকে ঘিরে আজ নগরীর শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণ, বোধনের আয়োজনে ডিসি হিলে, প্রমার আয়োজনে সিআরবির শিরিষতলায় সকাল থেকেই শুরু হবে বসন্ত বরণের অনুষ্ঠান । বসন্ত নিয়ে একাধিক অনুষ্ঠান থাকবে আশেপাশের বিভিন্ন স’ানেও।
বাসন্তী রঙের শাড়িতে সবুজ আঁচল উড়িয়ে নারীরা ছুটে চলবে পুরো শহরময়। চলবে বসন্ত বরণের আনুষ্ঠানিকতা। সর্বপরি বাঙালি সংস্কৃতিতে পহেলা বৈশাখের পরেই পহেলা ফাল্গুনের জনপ্রিয়তা সবচাইতে বেশি। বাঙালি সংস্কৃতিতে ষড়ঋতু নিয়ে ভালোবাসার যেন কমতি নেই।
সব ঋতুকে বরণ করে নেয়ার পর ঋতুরাজ বসন্তে এসে ক্ষান্ত হয় বরণডালা, প্রকৃতিতে আসে পরিবর্তন, পুরোনোকে পেছনে ফেলে এগিয়ে আসে নতুনের হাতছানি।
আজ প্রকৃতি জুড়ে সাজ সাজ রব। হিমেল পরশে বিবর্ণ প্রকৃতিতে জেগে উঠছে নবীন জীবনের ঢেউ। নীল আকাশে সোনা ঝরা আলোকের মতই হৃদয় আন্দোলিত। আহা! কী আনন্দ আকাশে বাতাসে ‘আহা আজি এ বসন্তে /কত ফুল ফোটে কত বাঁশি বাজে/কত পাখি গায়।
পাতার আড়ালে আবডালে লুকিয়ে থাকা বসন্তের দূত কোকিলের মধুর কুহুকুহু ডাক, ব্যাকুল করে তুলবে অনেক বিরোহী অন্তর। কবি তাই বলেছেন, ‘সে কি আমায় নেবে চিনে/ এই নব ফাল্গুনের দিনে’।
তবে বসন্তের সমীরণ বলছে এ ঋতু সব সময়ই বাঙালির মিলনের বার্তা বহন করে। কারণ বসন্তেই ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত আর তারই মধ্যদিয়ে বাঙালির স্বাধীনতার বীজ রোপিত হয়েছিল। বসন্তেই বাঙালি মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিল। অর্জিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। সেই উদ্দীপনায় আজি এই বসন্তে-আনন্দের সরণী হয়ে হাঁটবো আমরা। একত্রে আনন্দ আয়োজন এই উৎসবে। বাঙালির বাস্তব ও শিল্পচৈতন্যে এই অসাম্প্রদায়িক উৎসবের গুরুত্ব বেশ তাৎপর্যময়।