চাক্তাইয়ে বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড

আগুন কেড়ে নিল শিশুসহ ৯ প্রাণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

নগরীর চাক্তাই ভেড়ামার্কেট এলাকার একটি বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দুই পরিবারের সাতজনসহ নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে এক শিশুও রয়েছে। আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন। পাঁচ-ছয়টি কলোনিতে বিভক্ত ভেড়া মার্কেট বস্তির দুই শতাধিক ঘর ও ২০টি দোকান পুড়ে গেছে।
রোববার ভোররাত সাড়ে তিনটার দিকে এ ঘটনা ঘটে। আগুনে হতাহতের এ ঘটনা সাম্প্রতিককালে চট্টগ্রামে সবচেয়ে বড় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। অগ্নিকাণ্ডে নিহতরা হলেন- রহিমা বেগম (৫০), তার মেয়ে নাজমা আকতার (১৬), ছেলে মো. জাকির হোসেন (১০), মেয়ে নাসরিন আকতার (৬), আয়েশা আকতার (৩৭), তার বোনের ছেলে মো. সোহাগ (১৮), হাসিনা আকতার ও অজ্ঞাত দু’জন। প্রাণে বেঁচে গেছে রহিমার এক মেয়ে নার্গিস (১০)।
দমকল বাহিনীর কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন জানান, রোববার ভোর সাড়ে তিনটার দিকে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে পুড়ে যায় ভেড়ামার্কেট বস্তির অন্তত দুইশ’ সেমিপাকা ও কাঁচা ঘর এবং দোকান।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১২টি ইউনিট ঘটনাস’লে পৌঁছে প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এরপর ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে প্রথমে ৮ জনের, পরে এক শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহতদের সাতজনই দুটি পরিবারের সদস্য বলে জানিয়েছে দমকল বাহিনী। সূত্রটি বলছে, ঘুমন্ত অবস’ায় মর্মান্তিকভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী রুমা বেগম জানান, আগুন লাগার পর দুই সন্তান নিয়ে বেরিয়ে যান রহিমা। পরে তার মেয়ে নাজমার বিয়ের জন্য রাখা নগদ দুই লাখ টাকা ও স্বর্ণালংকার আনতে গিয়ে আগুনে পুড়ে মারা যান রহিমা ও তার তিন ছেলে-মেয়ে। ঘরে তালা লাগানো থাকায় আগুন লাগার পর বেরুতে না পারায় আরেক পরিবারের মারা যায় তিনজন। আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, আগুন লাগার পর বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে তার ছিঁড়ে গায়ের ওপর পড়লে রহিমা ও তার তিন ছেলে-মেয়ে নিহত হয়।
আগুন লাগার খবর পেয়ে ঘটনাস’লে আসেন জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন। দুর্ঘটনায় নিহতের স্বজনদের সঙ্গে তিনি কথা বলেন ও আহতদের খোঁজখবর নেন। আগুনের কারণ অনুসন্ধানে জেলা প্রশাসকের নির্দেশে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাশহুদুল কবীরকে আহ্বায়ক ও ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা আলী আকবরকে সদস্যসচিব করা হয়। তাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে অগ্নিকাণ্ডের কারণ জানানোর নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
এছাড়া অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ এবং যাদের ঘর পুড়ে গেছে তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, ‘ভেড়া মার্কেটে এক হাজারেরও বেশি লোক বসবাস করেন। এখানে দখল-বেদখলের একটি বিষয় নিয়ে কয়েকটি গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে বিবাদে লিপ্ত বলে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে। ঘটনার তদন্ত শেষে আগুন লাগার কারণ জানা যাবে।’
প্রত্যক্ষদর্শী রমজান আলী জানান, যখন ঘরে আগুন লাগে তখন সবাই গভীর ঘুমে ছিলেন। ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে চারদিক আচ্ছন্ন হয়ে যায়। তাড়াহুড়ো করে বেরুতে গিয়ে দরজায় লাগানো তালায় বাধে বিপত্তি। চাবি খুঁজে না পেয়ে তালাও ভাঙতে পারেননি। এ কারণে ঘরে ভেতর জীবন্ত দগ্ধ হয়ে প্রাণ হারান দুই পরিবারের সাতজনসহ ৯ জন। বস্তির প্রবেশমুখে ‘ফরিদ সওদাগর কলোনিতে’ মুদি দোকান করতেন সুরুজ আলীর স্ত্রী রহিমা। দোকান সংলগ্ন সেমিপাকা ঘরে চার সন্তান নিয়ে থাকতেন রহিমা। সুরুজ মিয়ার দুই স্ত্রী। প্রথম স্ত্রী ও তার তিন সন্তানকে নিয়ে একই বস্তিতে থাকেন সুরুজ মিয়া। তার গ্রামের বাড়ি সিলেট জেলায়। প্রায় ৩০ বছর আগে চট্টগ্রাম শহরে আসেন।
নিহত রহিমার বেঁচে যাওয়া মেয়ে নার্গিস আকতার বলেন, ‘আগুন লাগার পর মা খুব চিৎকার করছিলেন। ঘর থেকে বেরিয়ে সবাইকে জাগিয়ে তোলেন। কিছুক্ষণ পর ঘরে ফিরে আসেন। এসময় আমার ভাই জাকির হোসেন দোকানের পেছনের দরজা ভেঙে দিলে আমি সেদিকে লাফ দিয়ে বেরিয়ে আসি। আমার ভাই মা ও বোনদের বের করার চেষ্টা করতে গিয়ে আর বেরুতে পারেনি।’
ভেড়া মার্কেট বস্তির বাসিন্দা চকরিয়া উপজেলার মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘কয়েকদিন ধরে চোরের উৎপাত বেড়ে যাওয়ায় ঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে ঘুমাই। প্রথমে খালের পাশে রহিমার দোকানের সামনে চটের বস্তায় আগুন লাগে। এরপর মুহূর্তের মধ্যে আগুন পুরো বস্তিতে ছড়িয়ে পড়ে। আগুন লাগার পর ঘরের তালা খুলতে গিয়ে দেখি চাবি পাচ্ছি না। দা দিয়ে তালা ভেঙে বেরিয়ে আসি।’ আগুনে মারা গেছেন বস্তির আরও এক পরিবারের দুইজন। তারা হলেন-আয়েশা আকতার (৩৭) ও তার ভাগ্নে সোহাগ (১৮)। ঘটনার পর থেকে আয়েশার ১১ বছরের মেয়ে ঋতু আকতারের খোঁজ মিলছে না বলে জানিয়েছেন আয়েশার ভাই মনির হোসেন। তিনি (মনির হোসেন) জানান, তার ভাগ্নে সোহাগ চা-দোকানে কাজ করত। থাকত খালার বাসায়। আয়েশার স্বামী নেই। একই কলোনির বাসিন্দা সামশু মিয়ার স্ত্রী হাসিনা আকতার মারা গেছেন।
সকাল নয়টার দিকে ঘটনাস’লে গিয়ে দেখা গেছে, সর্বনাশা আগুনে কেউ হারিয়েছে স্বজন, কেউ সারা জীবনের সঞ্চয়- নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার, পরনের কাপড়, কাঁথা-বালিশ। খোলা আকাশের নিচে ক্ষতিগ্রস্ত নারী-পুরুষ ও শিশু। শুধুই কাঁদছেন তারা। মা-বাবাকে ঘিরে ক্ষুধা আর আতঙ্কে কান্নাকাটি করছে শিশুরা। বাতাসে ভেসে আসছে পোড়া মাটির গন্ধ। পুড়ে যাওয়া জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কোথাও পড়ে আছে শিশুর খেলনা, কোথাও হাঁড়ি-পাতিল, কাপড়-চোপড় ও আসবাবপত্র। ধোঁয়া উড়ছে পোড়া টিনের চাল, বাঁশ ও বেড়া থেকে। কেউ পুড়ে যাওয়া জিনিসপত্র ছাইয়ের মধ্যে খুঁজে ফিরছে। পোড়া টিন ছাড়া কিছুই চোখে পড়ছে না। সব হারিয়ে শুধুই কাদঁছেন বস্তিবাসী। তাদের একজন চকরিয়া উপজেলার মনোয়ারা বেগম। তিনি সাত্তার সওদাগর থেকে মাসিক সাড়ে চার হাজার টাকায় একটি বাসা ও দোকান ঘর নিয়েছেন। তিনি মুদি দোকান করতেন। আগুন তার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। একথা বলে হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন।
রুমা বেগমের গ্রামের বাড়ি সিলেটে। তিনি বলেন, ‘ব্যাংক থেকে দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়ে বস্তিতে দোকান দিয়েছি। আগুন লাগার পর কিছুই বের করতে পারিনি। আমি ও সন্তানরা শুধু পরনের কাপড়টা নিয়ে প্রাণে বেঁচে গেছি।‘ রুমার দাবি, বৈদ্যুতিক শট সার্কিট কিংবা রান্নার চুলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়নি। এটি নাশকতা।
আগুনে ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, ভেড়া মার্কেট বস্তিতে আছে পাঁচ-ছয়টি কলোনি। একেকটি কলোনিতে ৩০ থেকে ৪০টি ঘর। কিছু ঘর ও দোকান ছিল সেমিপাকা। বেশির ভাগ ঘর টিনশেড ও বেড়ার। প্রায় দুই লাখ বর্গফুট আয়তনের বস্তির জায়গাটি সরকারি খাস জমি। বেলাল, ফরিদ, মোরশেদ, সাত্তারসহ আরও কয়েকজন ব্যক্তি জায়গাটি দখলে নিয়ে বস্তি ও দোকান ঘর নির্মাণ করেছেন। তারা প্রতিমাসে ভাড়া বাবদ আয় করেন লাখ লাখ টাকা। কিছু ঘর ও দোকানে বৈধ সংযোগ থাকলেও বেশির ভাগ ঘরে ছিল অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ। বৈদ্যুতিক তারগুলো ছিল ঝুঁকিপূর্ণ অবস’ায়। বস্তি সংলগ্ন এলাকায় কয়েকটি মার্কেট, দোকানপাট ও পোশাক কারখানা রয়েছে। দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আসায় সেগুলো রক্ষা পেয়েছে দাবি ফায়ার সার্ভিসের।