‘আগুন ও উন্মত্ততা’ নয় শান্তিই মানবজাতির অন্বেষা

সুভাষ দে

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসলীলা ও মানব ট্র্যাজেডির করুণ অধ্যায় মানুষের মন থেকে মুছে যায়নি। যুদ্ধের শেষে ১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক বোমা নিক্ষেপের ফলে দুই শহরের দুই লক্ষাধিক মানুষ তাৎক্ষণিক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে, আহত হয়েছে অগণিত মানুষ অর্ধশতাব্দী পর্যন্ত এই দুই শহরের মানুষ পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়ার মারাত্মক প্রতিক্রিয়ার শিকার হয়েছে। আগস্ট এলেই যুদ্ধের উন্মত্ততা ও তার অভিশাপ জাপানের মানুষকে শোকে বেদনায় ব্যাকুল করে তোলে। কিন্তু যুদ্ধোন্মাদনা থেকে বিশ্বাবাসী রেহাই পায়নি বিশ্বের নানা প্রান্তে সেই একই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং তার সাঙ্গপাঙ্গরা মানবসভ্যতার বিনাশযজ্ঞে সক্রিয়।
কোরীয় উপদ্বীপের পরিস্থিতি আজ যে পর্যায়ে উপনীত হয়েছে তাতে বিশ্ববাসী পারমাণবিক যুদ্ধের সেই আশংকারই আলামত যেন দেখতে পাচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পিয়ং ইয়ংয়ের হুমকি অব্যাহত থাকলে বিশ্ববাসী এক অভূতপূর্ব ‘আগুন ও উন্মত্ততা‘ প্রত্যক্ষ করবে’। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া এক বিবৃতিতে বলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের ফন্দি ফিকিরের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক ‘যুদ্ধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূ-খণ্ডসহ সব শত্রুঘাঁটি নির্মূল করে উচিত জবাব দেয়া হবে’। উত্তর কোরিয়া প্রশান্তমহাসাগরীর দ্বীপ গুয়ামের মার্কিন ঘাঁটি আক্রমণ করার হুমকি দিয়েছে। দেশটি’র প্রায় ২ লক্ষ মানুষ এখন আতংকে।
কয়েকদিন আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী উত্তর কোরিয়াকে কূটনৈতিক ভাষা উপলব্ধি করার অক্ষমতা নিয়ে বলেছেন কিন্তু তাঁর প্রেসিডেন্ট যে ভাষা ব্যবহার করেছেন তাতে কূটনৈতিক শিষ্টাচার রক্ষিত হয়েছে কি? উত্তর কোরিয়ার সাথে বাগাড়ম্বরপূর্ণ ভাষা ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা কেননা ইতিমধ্যেই দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারিতে বিশ্বের অর্থবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ায় তারা এই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এটি দুর্ভাগ্যজনক যে আমেরিকার জনগণ এমন এক ব্যক্তিকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করেছেন যিনি শত্রুতা, জিঘাংসা মতো অমানবীয় বিষযগুলিকে রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে স্থাপন করেছেন।
বিগত শতকে দ্বিতীয় বিম্বযুদ্ধের সমাপ্তির পরও বিশ্বে যুদ্ধ কংমেনি বরং আঞ্চলিক পরিধিতে যুদ্ধ সংঘাত- উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে, কোরীয় উপদ্বীপও তার বাইরে থাকেনি। ১৯৫৩ সালে সেখানে যুদ্ধের কৌশলগত সমাপ্তি ঘটেছে এর বিভাজনের মধ্য দিয়ে। উত্তর কেরিয়া চীনসহ সমাজতান্ত্রিক দুনিযার সমর্থন পেয়েছে, অন্যদিকে দক্ষিণ কেরিয়া আমেরিকাসহ পুঁজিবাদী বিশ্বের সমর্থন পেয়েছে। অথচ একই বর্ণ-গোত্রের মানুষের কোরীয় উপদ্বীপটিকে বিভক্ত করা হলো। দক্ষিণ কোরিয়া গণতান্ত্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে এগিয়ে গেলো, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলো। উত্তর কোরিয়ার পরিস্থিতি এর সম্পূর্ণ বিপরীত। অর্থনৈতিক সামাজিকভাবে দেশটি এখনো পশ্চাদপদ। কিম ইল সুং এর পর পারিবারিক আমলই চলছে অথচ বলা হচ্ছে দেশটি কমিউনিষ্ট মতাদর্শে বিশ্বাসী।
দুই কোরিয়া বিভিন্ন সময় ছোট ছোট সংঘাতেও জড়িয়ে পড়েছে। সময় সময় সম্পর্কের অগ্রগতির নমুনা থাকলেও বিশ্ব রাজনীতির দাবাখেলায় দুই কোরিয়া একত্রীকরণ বাধাগ্রস্থ হয়েছে অন্যদিকে দুই জার্মানি একীভূত হয়েছে। শান্তি ও মানবতার স্বার্থেই দুই কোরিয় একত্রীকরণ বাঞ্চনীয়। এজন্যে দুই দেশের সরকার ও জনগণের সদিচ্ছা প্রয়োজন, প্রয়োজন আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ কেরিয়া গঠনে এগিয়ে আসা। উত্তর কোরিয়ার পরমানু অস্ত্র তৈরি ও গবেষণা বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্র বিগত দুই/তিন দশক ধরে চাপ দিয়ে আসছে যেমনভাবে তারা ইরানকে নানা পদক্ষেপের মাধ্যমে পরমাণু গবেষণা থেকে বিরত রাখতে চেয়েছে। দীর্ঘসময় ধরে জাতিসংঘের মাধ্যমে অর্থনৈতিক অবরোধও দিয়েছে। উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধেও কয়েকদিন আগে জাতিসংঘ বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সামরিক বা অর্থনৈতিক জোটে আবদ্ধ পারমানবিক শক্তিধর রাষ্ট্র যেমন ভারত, পাকিস্তান, ইসরাইয়েল তাদের পারমানবিক অস্ত্রভাণ্ডার বিষয়ে দেশটিকে সরব হতে দেখা যায়না।
যে সকল দেশ পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হয়েছে তাদের উচিত বিশ্বকে পরমাণু যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে পরিত্রাণ দিতে কার্যকর চুক্তিতে উপনীত হওয়া। তাদের অবশ্যই পারমাণবিক অস্ত্র প্রয়োগ বন্ধ রাখতে হবে। এতদসংক্রান্ত কোন হুমকি দেওয়াও চলবেনা। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে এসব দেশের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার হ্রাস করায় প্রচেষ্টা নিতে হবে। বিপদজনক গবেষণা থেকে বিরত থাকতে হবে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং কিম জন-ইং য়ের বক্তব্য যুদ্ধোন্মাদনা ছড়িয়ে দিচ্ছে। এই বাগযুদ্ধ কূটনৈতিক শিষ্টাচারবর্জিত, দুই নেতার এই দাম্ভিকতা দু দেশের জনগণ তো বটেই বরং বিশ্বাবাসীর জন্য কতটা উদ্বেগের কারণ হচ্ছে তা তাঁরা বুঝতে পারছেন না। গুয়াম দ্বীপের মানুষ পারমাণবিক হামলা হলে তা থেকে কি ভাবে আত্মরক্ষা করবে তার মহড়া শুরু করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন এবং গণমাধ্যম ট্রাম্পের বিবৃতি, বক্তব্য ভালভাবে নিচ্ছেনা। আমেরিকার রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও সচেতন মানুষ এই ‘যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা’ থেকে ট্রাম্পকে বিরত রাখতে জনমত গড়ে তুলবেন।
বিগত শতকের ষাটের দশকে কিউবা সংকট, ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় আমেরিকার লেখক বুদ্ধিজীবী ও শান্তিকামী মানুষ যে ভূমিকা নিয়েছিলেন তা যুক্তরাষ্ট্রের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছিলো।
একসময জোট- নিরপেক্ষ আন্দোলন, বিশ্বশান্তি পরিষদ ও মহাদেশীয় আঞ্চলিক নানা সংস্থা দুই বৃহৎ শক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে কূটনৈতিক ভারসাম্য রাখতে, তৃতীয় নিশ্বের অনেক ব্যক্তিত্বশালী রাষ্ট্রনেতা দু পক্ষের ওপর প্রভাব বিস্তার কতে পারতেন। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের ফেডারেল কাঠামো ভেঙে যাওয়ায় বিশ্বাব্যাপী সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপর্যয় আমেরিকাকে ‘আগ্রাসী’ শক্তির ভূমিকায় নিয়ে এসেছে, ফলে তার পক্ষে ইরাক, লিবিয়া, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান ও সর্বশেষ সিরিয়ায় একতরফা সামরিক নীতি চাপিয়ে দেওয়া সহজ হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে এ ধরনের কোন ব্যবস্থা নেয়া আমেরিকার পক্ষে সহজসাধ্য হবে না কারণ উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সাজসজ্জা দেশটির জনগণের ঐক্য সর্বোপরি উত্তর কোরিয়ার প্রতি চীনের সমর্থন। চীন উত্তর কোরিয়া প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা করেছে। দেশটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ৮০-৯০ শতাংশ চীনের ওপর নির্ভর করে। সুতরাং চীন একটি যুদ্ধের মতো অবস্থায় জড়াবেনা। আর তা চীনের স্থিতিশীলতার জন্যও সহায়ক হবে না। অন্যদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন, উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা দক্ষিণ কোরিয়াও জাপানকে ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। এমনকি এই যুদ্ধ বিশ্বকে বিপর্যয়ের মধ্যে নিক্ষেপ করবে এমন ধারণা বিশ্লেষকদের। রাশিয়া, চীন, জাপান, ফ্রান্স, দু পক্ষকে সংযত আচরণ করতে বলেছে এবং কূটনৈতিক পন্থায় আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা নিরসনের কথা বলেছে। ট্রাম্প নিশ্চয়ই জেনে গেছেন ইউরোপের দেশগুলি আগের মতো যুক্তরাষ্ট্রের যে কোন পদক্ষেপে সমর্থন জানাবেনা, ব্রিটেন তো নয়ই, এমন কি কানাডা, আস্ট্রেলিয়াও সাবধানে প্রতিক্রিয়া দেখাবে যদিও অস্ট্রেলিয়া যুদ্ধ হলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে থাকবে বলেছে।
আমরা মনে করি আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান খুঁজতে অবিলম্বে ৬ জাতি (যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, জাপান, উত্তর কেরিয়া ও দক্ষিণ কেরিয়া) বৈঠক আহ্বান করার প্রচেষ্টা নিতে হবে। জাতিসংঘ এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে পারে। উত্তর কোরিয়ার বিরদ্ধে ‘অবরোধ আরোপ, সংকটের সমাধান নয়, ইরাক, ইরানের বিরুদ্ধে ‘পারমাণবিক অস্ত্র আছে‘ এই অজুহাত তুলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আহবানে জাতিসংঘের অবরোধ দুই দেশের জনগণকে অমানবিক পরিস্থিতির মুখেই ঠেলে দিয়েছিল।
জাতিসংঘের উচিত হবে বিশ্বকে পরমাণু যুদ্ধের হুমকি ও পরমাণু অস্ত্রের প্রতিযোগিতা বন্ধে একটি কার্যকর সমাধান সূত্র বের করা।
লেখক : সাংবাদিক