আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে দীর্ঘদিনের সহযাত্রীদের প্রতিক্রিয়া

আজিজুল কদির

তাঁর এই চলে যাওয়া কেউই মেনে নিতে পারছেন না। বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতের সকলের কাছেই এটি আকস্মিক একটি ধাক্কা। তাঁর সঙ্গে কত স্মৃতি, কত গল্প। চোখের সামনে ভেসে উঠা কত ঘটনা। ভাবতেই পারছে না ব্যান্ড সঙ্গীতের উজ্জ্বল নক্ষত্র আইয়ুব বাচ্চু আর ফিরে আসবেন না। তুলবেন না গিটারে ঝড়, গাইবেন না গান। তার শূন্যতা চিরকাল থেকে যাবে। সোলস্ এর সাথে চলার পথে দীর্ঘদিনের সহযাত্রীদের প্রতিক্রিয়ায় উঠে এসেছে নানা স্মৃতি জাগানিয়া কথা। চট্টগ্রাম মুসলিম হল সংলগ্ন এলাকায় নির্মিতব্য সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স এর কোন একটা অংশ আইয়ুব বাচ্চুর নামে করার দাবিও করেছেন তারা। সংগীতের প্রতি তার জীবন ছিল নিবেদিত: আহমেদ নেওয়াজ
বাচ্চু উপমহাদেশের অন্যতম সেরা গিটারিস্টদের একজন। আমার হাত ধরেই সোলসে এসেছিল আইয়ুব বাচ্চু। তখন ১৯৮২ সাল। ১৯৭৩-৭৪ সালে সোলসের যাত্রা শুরু হয়। শুরুর দিকে ভালোই চলছিল। কিন’ ১৯৮২ সালের দিকে সংকটে পড়ে সোলস। এই সংকট ছিল গিটারিস্টের। ওই সময়ে শুনতে পাই আইয়ুব বাচ্চুর কথা। নগরের দেওয়ানহাট এলাকার একটি রেস্তোরাঁয় কথা হলে তাঁকে সোলসে যোগ দিতে বলা হয়। এরপর গিটারিস্ট হিসেবে সোলসে যোগ দেয় সে। বাচ্চু যোগ দেওয়ার পর সোলসের গানের ধরন পাল্টে যায়। আমরা বিকেলে সবাই দুই-তিন ঘণ্টা প্র্যাকটিস করতাম। কিন’ বাচ্চু রাত দুই-তিনটা পর্যন্ত প্র্যাকটিস করতো। সংগীতের প্রতি তার জীবন ছিল নিবেদিত। তাই আজকের রূপালী গীটারের যাদুকর হয়ে উঠেছে। আগামীতে তাকে ঘিরে চট্টগ্রামে কিছু একটা করতে চাই। আর এই দাবি সবার হোক। চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁকে নিয়ে হোক কোন কমপ্লেক্সের নামকরণ।
অকৃত্রিম ভালোবাসা দিয়ে মিউজিক করত: সুব্রত বড়-য়া রণি
আইয়ুব বাচ্চু ছিল একাধারে গীতিকার, সুরকার ও প্লেব্যাক শিল্পী। সেই সোলস্ থেকে শুরু করে চার দশক বাংলাদেশের তরুণদের গিটারের মূর্ছনায় মাতিয়ে রেখেছিল ও। গিটার বাদনে তার খ্যাতি ছিল পুরো ভারতীয় উপমহাদেশেই। অকৃত্রিম ভালোবাসা দিয়ে সে ব্যান্ড মিউজিক করত। গানের জন্য তার পরিশ্রম, সাধনা ও প্যাশন ছিল সার্বক্ষণিক। সে নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান ছিল। ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে একজন আইয়ুব বাচ্চু। গিটারের অবিরাম সুরের মূর্ছনায় আইয়ুব বাচ্চু ভক্তদের মাতিয়ে তুলত। বাচ্চুর গিটার বাজানো দেখে দেশের হাজার হাজার তরুণ গিটার বাজাতে উদ্বুদ্ধ হয়েছে, গিটার বাজানো শিখেছে। টানা ১০ বছর সোলসের লিড গিটার বাজিয়েছে। তাতে সোলস্ অন্য মাত্রা পায়। কত কত স্মৃতি! সবগুলো এখন একে একে হৃদয়ে বাজছে। সঙ্গীত সাধনা ও জনপ্রিয়তার চূড়ায় থাকাবস’ায় সে চলে গেছে।
অনেক শো করেছি আমরা একসঙ্গে। একসঙ্গে অনেক গল্প হয়েছিল। অনেক মান-অভিমান ছিল দু’জনের মধ্যে। তবু একসঙ্গে থাকা অবস’ায় কোনো জিনিস আলাদা করতাম না। বিষয়টি এমন যে, এক কাপ চাও ভাগ করে খেতাম। কত স্টেজ শো আমরাও মাতিয়েছিলাম, রাত কাটিয়েছি একসাথে। কত গল্প হয়েছে! আজ সবই স্মৃতি! ভাবতেই চোখের কোণে জল চলে আসে।
সঙ্গীতাঙ্গন দ্বিতীয় আইয়ুব বাচ্চুকে পাবে না: নকিব খান
সপ্তাহ দুয়েক আগেও স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে বাচ্চু।সুস’ হয়ে সে আবার গানে ফিরেছিল। নতুন করে আইয়ুব বাচ্চুকে পেয়েছিল দর্শক-শ্রোতারা। কিন’ এ যাত্রায় সে চলেই গেল! তার সঙ্গে কত স্মৃতি, কত গল্প। এসবই চোখের সামনে ভেসে উঠছে। একসঙ্গে কত স্টেজ শো করেছি। তার অনবদ্য গীটার বাজনা তরুণদের গীটারের প্রতি আকর্ষণ নেশা জাগিয়েছে। সেই ব্যান্ড সংগীতের আগ্রহ বাড়িয়েছে নিঃসন্দেহে। ভাবতেই পারছি না ব্যান্ডসঙ্গীতের উজ্জ্বল নক্ষত্র বাচ্চু আর ফিরে আসবে না। তুলবে না গিটারে ঝড়, গাইবে না গান। সঙ্গীতাঙ্গন আর দ্বিতীয় আইয়ুব বাচ্চুকে পাবে না। তার শূন্যতা চিরকাল থেকে যাবে।
দুই বাংলাতেই সমান জনপ্রিয় : র্যালি পিনারো
বাচ্চু অত্যন্ত রসিক ছিল। দুষ্টুমিতে মেতে থাকত সব সময়। যেখানেই থাকো, ভালো থেকো বন্ধু। বাংলা ভাষাভাষী তরুণ প্রজন্মকে জাগিয়ে রাখার জন্যই গান করেছিল সে। স্বাধীনতা পরবর্তী সোলস্ থেকে শুরু করে প্রায় তিন যুগ ধরে এমন অসংখ্য কিশোরের অসংখ্য স্মৃতি বিনির্মাণে যে নামটি জড়িত তা কিংবদন্তী আইয়ুব বাচ্চু। একাধারে একজন গায়ক, গীতিকার ও সুরকার- একজন লিভিং রকস্টার বাচ্চু। আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন একজন গীটার শিক্ষক। আমাদের দেশে ব্যান্ডসংগীতে এরকম শিক্ষক নেই বললেই চলে। হঠাৎ তাঁর এই মৃত্যুতে আমরা বন্ধুরা অসম্ভব মর্মাহত। আমরা সবাই তাঁকে মিস করব। বাচ্চুর সংগীতের অনুপ্রেরণা জিমি হেন্ডরিক্স, জো স্যাটরিনি, স্টিভ মুর এমন অনেকেই। তবে তাঁর গানে ছিল প্রাচ্যরীতি। তাই তাঁর গান নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে যেমন দর্শক নন্দিত হয়েছে, তেমনি তাঁকে দুই বাংলাতেই করেছে সমান জনপ্রিয় সেই সাথে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। ‘সেই তুমি’, ‘রুপালি গিটার’, ‘ঘুমন্ত শহরে’, ‘ফেরারি এই মনটা আমার’, ‘আমি কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘একদিন ঘুমভাঙা শহরে’, ‘চল বদলে যাই’, ‘এখন অনেক রাত’, ‘হাসতে দেখ, গাইতে দেখ’র মতো অসাধারণ সব গান বাচ্চু উপহার দিয়ে গেছে।
সুর তোলার ক্ষমতা ছিল অন্যরকম: মো. আলী
আমি, আইয়ুব বাচ্চু, কুমার বিশ্বজিত ১২/১৩ বছর বয়স থেকেই একসাথেই হেসে খেলে বেড়ে উঠেছি। আমরা তিনজন খেলাধুলা করতাম না। তবে মিউজিক নিয়ে খেলতাম। বাচ্চু গীটার আর আমি পারফেকশান এবং কুমার বিশ্বজিত একর্ডিয়ান বাজাত। ফলে সুর নিয়ে থাকতাম। আর তখন থেকেই দেখতাম বাচ্চুর যেকোন সুর তোলার ক্ষমতা ছিল অন্যরকম। যে সুর আমাদের দুইদিন লেগে যেত, বাচ্চুর তা লাগতো দুই ঘণ্টারও কম সময়। যা দেখে উপসি’ত সবাই মুগ্ধ হয়ে যেত। পাশ্চাত্য সুরের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল বরাবর। পরবর্তী কালে যা তাকে আরো পরিণত করেছে। ধীরে ধীরে গীটারে অনবদ্য হয়ে উঠে। সবার কাছে রূপালী গীটারের যাদুকর হয়ে উঠে অনায়সে। আইয়ুব বাচ্চু এই উপমহাদেশের একজন প্রখ্যাত গীটারিস্ট। আজ তাই বন্ধুর এই অকাল প্রয়াণে একটাই দাবি চট্টগ্রামে যে মুসলিম হল সংলগ্ন সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স হচ্ছে তার কোন একটা অংশ আইয়ুব বাচ্চুর নামে করা হোক।
বাচ্চু বেঁচে থাকবে তাঁর কর্মে: নাসিম আলী খান
তাঁর সঙ্গে অনেক কাজ করেছি। বাচ্চু আমাদের ছোটবেলার বন্ধু। আমরা চট্টগ্রামে হাঁটি হাঁটি পা পা করে সঙ্গীতের চর্চা শুরু করি। আমার প্রথম অ্যালবামের সঙ্গীত পরিচালকও ছিলেন তিনি। তার সঙ্গীতচর্চা তরুণ প্রজন্মের মাধ্যমে আজীবন জাগরূক থাকুক। বাচ্চু তার কর্ম দিয়ে আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকবে।