আইয়ুবের রবীন্দ্রনাথ

মুহম্মদ সাইফুল ইসলাম

আবু সয়ীদ আইয়ুব (১৯০৬-১৯৮২)-এর পরিচয় দিয়ে বিষয়টির ভিতের প্রবেশ করা ভালো। তিনি জন্মেছিলেন উড়িষ্যার এক ফারসি পরিবারে। তাঁর মাতৃভাষা ছিল উর্দু আর ধর্ম ইসলাম। তিনি লেখাপড়া শিখেছিলেন মিশনারি স্কুলে। সেখানে ফারসি ভাষাও শিখে ছিলেন। মাত্র তেরা বছর বয়সে উর্দু তরজমায় গীতাঞ্জলি পড়ে রবীন্দ্রনাথের প্রতি আকৃষ্ট হন। মহৎ কর্মের সম্যক পরিচয়ের আগ্রহ তাঁকে বাংলা শেখায় অনুুপ্রাণিত করে। বাংলা ভাষা তাঁর দ্বিতীয় মাতৃভাষা হয়। অবশেষে তিনিও বাঙালি হয়ে যান। পরে তিনি বাঙালি এক ব্রাহ্মণ-কন্যাকে বিয়ে করেন। এভাবে তিনি বাঙালির এক অসাধারণ শক্তিমান লেখক ও দার্শনিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। আজ তাঁর চিন্তা ও কর্মপ্রয়াস বাঙালি সংস্কৃতির অঙ্গীভূত উপাদান।
রবীন্দ্রনাথকে আমরা বাঙালি চিনে এসেছি এবং জেনে আনন্দ ও গৌরব অনুভব করেছি, আজো অনুভব করি, তিনি ‘বিশ্বকবি’। এই অভ্যাস আমাদের চেতনায় বসে গেছে। তাই এখনো আমরা রবীন্দ্রনাথকে এই বলে পরিচয় করাতে চাই আমাদের কালের প্রজন্মের কাছে। তাঁর জন্মদিনে, তাঁর মৃত্যু-শোকের স্মরণসভায় খুব আগ্রহের সঙ্গে আমরা বলে দিই তিনি কবিগুরু, ঋষি কবি। শুধু তাই নয়, তিনি কলকাতার বিখ্যাত ও অভিজাত ঠাকুর পরিবারে জন্মেছিলেন এবং ‘মহর্ষি’ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের যোগ্য উত্তরাধিকারী, যিনি জমিদার হিসেবে প্রজাপালনে অত্যন্ত কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। বলে পরিতৃপ্ত হতে চাই, তিনি ‘সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ জমিদার’ ছিলেন! কখনো কখনো এ কথাও বলতে ভুলি না যে, তিনি প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের পৌত্র! এমন অবিরল ও অপ্রতিরোধ্য প্রশস্তিবাক্যে রবীন্দ্রনাথের পরিচয়কে আমরা বড় বলে জানি এবং মানি। অগণিত সমালোচকের কাছে, বক্তৃতার মঞ্চের অসংখ্য বক্তায় রবীন্দ্রনাথ এইভাবে পূজা পেয়ে এসেছেন!
অপূর্ব চিন্তা ও সুন্দর কর্মে হয়ে ওঠা বাঙালি আইয়ুবের দেখা রবীন্দ্রনাথ আর আমাদের দেখা রবীন্দ্রনাথের মধ্যে তৈরি হয় এক মৌল পার্থক্য। আইয়ুব বিশ শতকের মধ্যপর্বে রবীন্দ্রনাথের এইসব পরিচয়ের গোড়া কেটে দিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, রবীন্দ্রনাথ ‘ঠাকুর পরিবারে’ জন্মেছিলেন কিনা, তিনি ‘বিশ্বকবি’ কিনা, তিনি ‘সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ জমিদার’ কিনা, তিনি ‘কবিগুরু’, ‘ঋষি কবি’ এবং ‘মহর্ষি’ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের যোগ্য সন্তান কিনা–এইসব অনুসন্ধান করা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথেরই রুচি বিরুদ্ধ ছিল। ত্রিশের দশকের আধুনিক কবিদের কাছেও এইসব পরিচয় পরিত্যক্ত হয়েছিল। কিন’ তাঁর কবিতার আধুনিকতা নিয়ে এই কবিদের মধ্যে প্রবল প্রতিকূল মনোভাব তৈরি হয়। কিভাবে আইয়ুব এই মনোভাবের মোকাবিলা করেন এবং তাঁর রবীন্দ্রনাথ কিভাবে চিরকালের আধুনিক হয়ে ওঠেন, সংক্ষেপে তাই বলা এই ক্ষুদ্র লেখাটির উদ্দেশ্য।
গীতাঞ্জলির উর্দু ও ইংরেজি এবং মূল বাংলা পড়ে কিভাবে এবং কেন আইয়ুব ‘রবীন্দ্র-কাব্যের বিচারে ও ব্যাখ্যায়’ নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন, সে নিয়ে তিনি খুব সংক্ষেপে পথের শেষ কোথায় বইয়ের ‘ভাষার শেখার তিন পর্ব এবং প্রসঙ্গত’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেন। সেখানে তিনি বলেন যে, তাঁর কালের নবীন এবং প্রবীণ কবির কাছে যখন রবীন্দ্রনাথ ‘অবহেলা’র পাত্র হয়ে উঠলেন, তখন তাঁর ‘মনের গভীর তল থেকে একটা দাবি দুর্বার হ’য়ে উঠলো–রবীন্দ্রনাথ-বিষয়ে তোমাকে কিছু লিখতেই হবে। কিছু হ’য়ে উঠলো অনেক-কিছু।’ তিনি লক্ষ্য করেছিলেন এই কবিদের কাছে রবীন্দ্রনাথের রূপ ছিল এক প্রশান্তিময় আদর্শের প্রতীক। তাঁদের কাছে যেন তিনি ছিলেন এক পরির দেশের বাসিন্দা, যেমনটা মনে করেছিলেন কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। আইয়ুব লিখেছেন, ‘জগতের অশুভ, কদর্য, বীভৎস রূপটা রবীন্দ্রনাথের চোখে ঠিকমতো ধরা দেয়নি, রোম্যান্টিক ভাবালুতায় রাঙানো গোলাপী কাচের বেশ পুরো চশমা প’রে তিনি সব-কিছুকে–মানুষকে, প্রকৃতিকে, সমগ্র বিশ্বচরাচরকে–অত্যন্ত শুভ ও সুন্দর ক’রে দেখেছেন, স্বভাবতই তাঁর মনে হয়েছে ধন্য এই মানবজীবন, ধন্য এই বিশ্বজগৎ।’ আধুনিকতায় বিশ্বস্ত কবিদের এই মনোভাবের বিরুদ্ধে আপত্তি তুলেছিলেন আইয়ুব। তিনি দেখিয়েছিলেন এতদিন পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তা যথার্থ নয়। রবীন্দ্রনাথকে দেখার দৃষ্টি এবং রবীন্দ্র-কাব্যের বিচার দুইই তাঁর কাছে ভিন্নতর এক মূল্য নিয়ে দেখা দেয়। সে দেখায় কবিরূপে রবীন্দ্রনাথ কীভাবে, কেমন করে আইয়ুবের চোখে ‘মহৎ থেকে মহত্তর’ হয়ে উঠেছিলেন, কেবল তারই অনুসন্ধান ছিল তাঁর আলোচনার বিষয়।
রবীন্দ্রনাথের প্রশস্তিমূলক পরিচয় পরিত্যক্ত হয়েও আধুনিকতার প্রশ্নে শঙ্খ ঘোষের কাছে আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছিল রবীন্দ্র-কাব্যের সার্থকতা। কবিতার সার্থকতাতেই কবির প্রকৃত পরিচয়–শঙ্খ ঘোষের এমন কথায় আইয়ুব তখনকার বিখ্যাত পত্রিকা কবিতা-পরিচয়-এর পাতায় এক ধরনের উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন। কবিতা-অকবিতা নিয়ে বিচার করতে নারাজ ছিলেন আইয়ুব। তিনি খুঁজে নিতে আগ্রহী ছিলেন কবিতায় কবির বক্তব্য। যার কথায় মন ভরে ওঠে তাকেই বলা যায় বন্ধু; যে-কবিতার বক্তব্যে দেখতে পাই নিজেরই ভাবনার প্রতিরূপ, সেই কবিতাকে বলি ভালো কবিতা–এই রকম একটা বিচার থেকেই নবজাতকের ‘প্রশ্ন’ কবিতাটি আইয়ুবের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল, শঙ্খ ঘোষ কিংবা আরো অনেকের কাছে সেটা অকবিতা হলেও।
এক কথায় আবু সয়ীদ আইয়ুবের চোখে আধুনিক কবির বক্তব্য : ‘যা কদর্য তাই সত্য, যা সত্য তাই কদর্য।’ এই বক্তব্যের উদ্গাতা ছিলেন আইয়ুবের মতে ফরাসি কবি বোদলেয়র। এঁর প্রভাব ত্রিশের দশকের বাঙালি কবিদের মধ্যেও গৃহীত হয়েছিল। এবং সে গৃহীত প্রেরণায় এঁদের চোখে ধরা পড়েনি যে, রবীন্দ্রনাথের কবিতায় কদর্য বা অমঙ্গলের স্পর্শ কম নেই। এই জবাব দেবার জন্যে আইয়ুব লিখেছিলেন আধুনিকতা ও রবীন্দ্রনাথ। এ বইতে তিনি দেখিয়েছেন, ‘অমঙ্গলের চেতনা রবীন্দ্র-কাব্যের বিভিন্ন পর্যায়ে কীভাবে কখনো সংকুচিত, কখনো সম্প্রসারিত হয়েছে এবং শেষ পর্বের কাব্যরচনায় কত গভীর ও পরিব্যাপ্ত হ’য়ে উঠেছে।’ অপরদিকে ‘কবি রবীন্দ্রনাথের সমগ্র বিশ্বনিরীক্ষা ও জীবনবোধ কেমন ক’রে পর্যায়ক্রমে পরিবর্তিত ও পরিণত হয়েছে, রোম্যান্টিক উদ্বেলতা ও বিষাদ থেকে ঈশ্বরপ্রেমের সমাহিত প্রশান্তি, সেখান থেকে দুই ভিন্ন পথে একই কালে এগিয়ে চলেছে পাশ্চাত্য হিউম্যানিজম-এর দিকে এবং এমন-এক ট্র্যাজিক চেতনার দিকে যাতে নক্ষত্রের ভাঙাগড়া, সভ্যতার উত্থান-পতন, মানুষের সেই দুঃখ, কোনো কালে যার অন্ত নাই–সব কিছুর মধ্যে ভীষণের প্রসন্ন মূর্তি দেখতে পাওয়া সম্ভব।’
আইয়ুব কী কেবল আধুনিকতাবাদ ও রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আধুনিক কবিদের জবাব দেবার জন্যে নিজের জীবনের সুবর্ণময় সময় ব্যয় করেছিলেন? না, তা নয়। তিনি পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। যদিও ইতিমধ্যে, অনেকটা কিশোর বয়সে, তাঁর নিজের ভাষ্যমতে, বার্ট্রান্ড রাসেলের ‘পাঁচ-সাতখানা গণপাঠ্য দার্শনিক পুস্তক হস্তগত ক’রে হ’য়ে উঠেছি ঘোরতর নাস্তিক।’ যদিও তিনি ‘মোটের উপর ডায়লেক্টিকে বিশ্বাসী।’ তবু আইয়ুবের এই মনকে গীতাঞ্জলি, পূরবী, পরিশেষ, পুনশ্চ থেকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের জীবনের অন্তিমপর্বের শেষ লেখা পর্যন্ত সমানভাবে উদ্দীপ্ত করে রেখেছিল! আইয়ুব লিখেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ প্রায় দ্বাদশ বর্ষকাল ধ’রে বহু যত্নে লালিত সরল মধুর আস্তিকতা থেকে স’রে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন পৃথিবীর বুকের উপর থেকে উড়ে-আসা আঁধির কর্কশ আঘাতে।’ সন্দেহ নেই, আইয়ুব নিজের অভিজ্ঞতার কোনো রঙ ও রেখার সমান্তরাল খুঁজছিলেন রবীন্দ্রনাথে। নইলে কী করে তিনি এ কথা বলতে পারেন যে, আস্তিকতা থেকে রবীন্দ্রনাথ সরে গিয়েছিলেন নাস্তিকতায়? কবে, কোন সময় থেকে ‘পূর্বসি’তি’ থেকে একেবারে ‘বিপরীত সি’তি’তে সরে গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ? এই জিজ্ঞাসার উত্তর দেওয়া সহজ নয়। আসলে সমগ্র রবীন্দ্রনাথে আইয়ুব খুঁজছিলেন ‘ডায়লেক্টিক’, যাতে তিনি নিজে বিশ্বাসী। রবীন্দ্রনাথের মধ্যেও তিনি সবসময়েই দেখাতে চেয়েছেন এই দ্বন্দ্ব। রবীন্দ্র-কাব্যপ্রবাহ থেকে তিনি খুঁজে খুঁজে বার করেছেন সংশয়, দুঃখ, ঘৃণা এবং অমঙ্গলবোধ। কিন’ এইসব নঞর্থকতা দিয়ে চিহ্নিত নন আইয়ুবের রবীন্দ্রনাথ। আইয়ুব নিজে বলেছেন, ‘সেই রবীন্দ্রনাথকে আমি অন্তরের মধ্যে গ্রহণ করেছি যিনি দুঃখের কবি, মৃত্যুর কবি হ’য়েও, হ’য়েই আনন্দের কবি, অমৃতের কবি।’ দ্বন্দ্ববিহানী নয়, আইয়ুবের রবীন্দ্রনাথ দ্বন্দ্ব অতিক্রমী কবি। তিনি মনে করেন, ‘সম্যক দৃষ্টি রবীন্দ্রনাথের বৈশিষ্ট্য; এবং সমদৃষ্টির প্রয়াস।’ এজন্যে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় তিনি তাঁকে বলেছেন, ‘পান’জনের সখা’। এঁর জীবন অভিজ্ঞতা, দৃষ্টি ও সৃষ্টি-সত্যের ‘সামগ্রিক মহিমা’ উপলব্ধি ও আবিষ্কার করা আইয়ুবের কাছে জীবন সাধনার এক অন্য নাম বলে মনে হয়েছিল। এজন্যে তিনি বলেছেন, ‘চলিত অর্থে আমি কাব্য-সমালোচক নই, রবীন্দ্র-প্রেমিক ব’লেই নিজের পরিচয় দিতে চাই।’ প্রেমাস্পদের দোষত্রুটি দেখতে পারে প্রেমিক, ‘কিন’ তার দ্বারা সীমানা নির্দ্ধারণ হয় না।’ আবু সয়ীদ আইয়ুবের কাছে রবীন্দ্রনাথ তাই ‘অন্তবিহীন’।