আইন প্রয়োগের পাশাপাশি আমাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন

মোহাম্মদ অংকন

‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনটি কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয়। এটি একটি সামাজিক আন্দোলন। দল, মত, নির্বিশেষে এ আন্দোলনকে বাস্তবায়ন করার অধিকার সকলেই রাখে। সকলেরই নিরাপত্তা লাভের অধিকার আছে। তাই দেশের আপামর জনগণ চায় নিরাপদে পথ চলতে, নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছতে। অনিরাপদ সড়কের কোণঠাসায় পড়ে স্বজন হারাতে কেউ চায় না। কেউই চায় না, সড়কে আহত হয়ে বিকালাঙ্গ জীবনযাপন করতে। কিন’ কোনো কিছুতেই আমাদের দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো যেন নিরাপদ হয়ে উঠছে না। প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় অকালে প্রাণ হারাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীরা লাশ হয়ে বাড়ি ফিরছে। গন্তব্য পথে কেউই যেন নিরাপত্তাবোধ করছে না। একটি স্বাধীন দেশে এমন দুঃসহ দুর্ঘটনা ঘটা ও দুর্ঘটনায় অকালমৃত্যু কখনই কাম্য নয়। কিন’ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ও মৃত্যুর পেছনে আমরা প্রথমত কাকে দায়ী করতে পারি?
বর্তমান সড়ক দুর্ঘটনার মহামারি রূপই বলে দিচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য কে বা কারা দায়ী। পরিবহন খাতে দুর্নীতি,যানবাহনের বেপরোয়া গতি, চালকের অসম প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব ও নিদারুণ খামখেয়ালিপনা, অপ্রশিক্ষিত চালক, মাদকাসক্ত ও অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক দিয়ে গাড়ি চালানো, রাস্তায় গণপরিবহনের আধিক্য, লাইসেন্সবিহীন চালক, ফিটনেসবিহীন গাড়ির ছড়াছড়িসহ নানা কারণে সড়ক পথ অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। চালকেরা কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করেই পথচারীদের ওপর গাড়ি চালিয়ে দিয়েও পার পেয়ে যাচ্ছে। তারা দেশের বিদ্যমান আইনসমুহ কোনো কিছুতেই আমলে নিচ্ছে না। গাড়ি চাপা দিয়ে মানুষ হত্যা করেও ঘুষ, তদবির আর ক্ষমতাশালী মালিকের আশ্রয়ে রেহাই পেয়ে যাচ্ছে। কিন’ এমন নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা আর কতকাল মেনে নেওয়া যায়? এ বিষয়ে আজ দেশের জনগণ সোচ্চার ও সচেতন হতে শুরু করেছে। তাই দেশে নিরাপদ সড়ক আইন চেয়ে সচেতন অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা দেশব্যাপী তীব্র আন্দোলনে নেমেছে। শিক্ষার্থীদের এমন একটি আন্দোলন বর্তমান প্রেক্ষিতে সত্যই প্রশাংসার দাবি রাখে।
আমরা দেখেছি, সারা দেশব্যাপী নিরাপদ সড়কের দাবি নিয়ে আন্দোলন চলেছে (এবং চলছে)। বাংলাদেশ সরকার এই আন্দোলনকে ইতিবাচকভাবেই দেখেছেন এবং আন্দোলনকারীদের সকল দাবি দাওয়া মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন এবং যেগুলো এখনই পূরণযোগ্য তিনি তা পূরণ করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন’ কিছু দুর্বৃত্তরা অতর্কিত হামলা ও মিথ্যা গুজব রটিয়ে আন্দোলনকে ভিন্নপথে পরিচালিত করার চেষ্টা চালিয়েছে। যাইহোক, এখন যেহেতু নিরাপদ সড়ক আইনের প্রস্তাবনা এসেছে, তাই সকলকে প্রস্তাবিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ঘরে ফিরে যাওয়া উচিত। শিক্ষার্থীদের পাঠে মনোযোগ দেওয়া উচিত। তারা দেশের জনগণকে সড়কে যে শৃঙ্খলতা দেখিয়েছে, তা সত্যই প্রশংসার দাবিদার। তারা দেখিয়ে দিয়েছে, কিভাবে গাড়ির লেন মেনে গাড়ি চালাতে হয়, লাইসেন্স না থাকলে কি ক্ষতি হতে পারে,উল্টোপথে গাড়ি চালানোর কুফল কি ইত্যাদি যা ছিল ট্রাফিক পুলিশের কাজ। এসব থেকে ব্যর্থ ট্রাফিক পুলিশেরাও নতুন কিছু শিখেছে আশা করছি। আমি এ পরিসরে যে কথাগুলো বলতে চাই, শুধু পরিবহন শ্রমিকদের আইন না মানার দোষ দিয়ে আমরা কখনই চুপ থাকতে পারি না। আমাদের পথচারীদের যেমন সচেতনতার অভাব রয়েছে, তেমনি রয়েছে অসাবধানতা। আমরা রাস্তায় নেমে লাগাতার ঠিকই আন্দোলন করছি, কিন’ কেউ কখনও এমন চিন্তা করেছি যে আমাদের ফুটপাত বাদ দিয়ে রাস্তার মধ্য দিয়ে হাঁটা যাবে না! আমরা পথচারীরা অনেকেই নিকটস’ ফুট ওভার ব্রিজ রেখে হাত দিয়ে গাড়ি থামিয়ে রাস্তা পারাপার হই, লাফ দিয়ে বাসে উঠি, যাত্রীভর্তি বাস দেখেও ভিড় ঠেলে উঠি। কিন’ এই সব বদঅভ্যাসগুলো পরিহার করতে না পারলে আমাদেরকে কোনো নিরাপদ সড়ক আইনই নিরাপত্তা দিতে পারবে না। কোনো দিনও সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধ হবে না। আমরা অসচেতন হয়ে যদি নিজের মৃত্যু ডেকে আনি, তাহলে সে দায়ভার রাষ্ট্রবহন করবে কি?
এখন থেকে আমাদের এ মনোবল তৈরি করতে হবে- আমি কি ফিটনেসবিহীন গাড়িতে উঠেছি? লাইসেন্স আছে কি না একটু জেনে নিই। এসব জানার অধিকার সকলের আছে। এবং চালক তার প্রয়োজনীয় প্রমাণ দেখাতে বাধ্য থাকবে। যদি এর ব্যতয় ঘটে তখনই আন্দোলন করতে হবে। প্রশাসনের আশ্রয় নিতে হবে। যদি চালকের লাইসেন্স না থাকে, তাহলে আমাদেরকে সে গাড়ি পরিহার করতে হবে, গাড়ি থেকে নেমে যেতে হবে। সামাজিকভাবে সে পরিবহনকে বয়কট করতে হবে। দেখা যাবে যাত্রীশূন্যতায় তারা ঠিকই নিয়ম মেনে রাস্তায় গাড়ি নামাবে।
আমরা গাড়িতে বসে লক্ষ্য করি, চালকেরা অনেকাংশেই সঠিক গতিতে বাস চালাচ্ছে। কিন’ তখন কেউ কেউ নিজেদের তাগিদেই বলে থাকি, ‘মামা গাড়ি কেন জোরে চালাও না?’ তখনই চালক মামা রেগে গিয়ে বেপারোয়া গতিতে গাড়ি চালাতে থাকে। পরিণামে দুর্ঘটনার শিকার হতে হয়। তাই আমাদেরকে গন্তব্যে যাওয়ার জন্য হাতে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে বের হতে হবে। নিজেদের তাড়াহুড়াকে চালকের ওপর বর্তিয়ে বিপদ ডেকে না আনাই শ্রেয়। আমরা যদি আমাদের অভ্যাসকে পরিবর্তন করতে পারি তাহলেই সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা কয়েকদিনের আন্দোলনের মাধ্যমে দেশবাসীকে শিখিয়ে দিয়েছে, জনগণ যদি নিয়ম মেনে চলে এবং সুশৃঙ্খলভাবে গাড়ি চালানো হয়, তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটবে না। আমরা অনেক সময় সরকারের সিদ্ধান্তকে দায়ী করি। কিন’ সরকার যেই সিদ্ধান্তই গ্রহণ করুক, তা বাস্তবায়নের দায়িত্বটা জনগণের ওপরও পড়ে। আমরা নিজেরা সব দেখে সব সরকারের উপর ছেড়ে দিলে পরিবর্তন কখনোই সম্ভব হবে না।
পরিশেষে বলতে চাই, শুধু আইনের প্রয়োগ হলেই যে সমস্যার সমাধান হবে, তা কিন’ মোটেও সত্য নয়। দেশের আইন প্রয়োগের পাশাপাশি আমাদের সচেতন হওয়া দরকার। উন্নয়নমুখী সরকার ও সচেতন নাগরিকই পারে দেশ থেকে সকল অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা দূর করতে। সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে, তাই এটি প্রতিরোধে সরকারকে সহযোগিতা প্রদান করা হোক। প্রস্তাবিত আইনের পাশাপাশি আর কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করলে সড়ক পথ নিরাপদ হবে, তা তুলে ধরা হোক। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নিরাপদ পথচলা নিশ্চিত হোক, নিরাপদে বেঁচে থাকা নিশ্চিত হোক সে প্রত্যাশা রাখি।

লেখক : কবি ও কলামিস্ট