সশস্ত্র সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজদের উৎপাতে স্থানীয়রা শংকিত

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি

নিজস্ব প্রতিনিধি, লামা

বান্দরবানের লামা-আলীকদমে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের উৎপাত দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশি-বিদেশি অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বাঙালি অধ্যুষিত উপজেলা সদরের আশপাশের বিভিন্ন গ্রামে প্রাণনাশের হুমকিসহ চাঁদা আদায় করছে সন্ত্রাসীরা। সন্ত্রাসী-চাঁদাবাজদের উৎপাতে গ্রামের প্রান্তিক কৃষকদের অবস’া সবচে’ বেশি খারাপ। অস্ত্র নিয়ে এসব সন্ত্রাসী ৮/১০জন করে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করে চলছে। সম্প্রতি সেনা অভিযানে আলীকদমে চারটি অস্ত্রসহ একজন সন্ত্রাসী আটকের পর কয়েকদিন শান্ত থাকার পর আবারো শুরু হয় তাদের কার্যক্রম। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লামা উপজেলার ছোট বমু, মেরাখোলা-বেগুণঝিরি, চিউনিরমুখ-বইল্যারচর, কুলাইক্যাপাড়া, লুলাইন, ক্যায়াজুপাড়া, নাইক্ষ্যংমুখ ইত্যাদি স’ানে ব্যাবসায়ি ও দরিদ্র কৃষকদের কাছ থেকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায় করছে। পাশাপাশি আলীকদম উপজলোর চৈক্ষ্যং কলাঝিরি, বাঘেরঝিরি, সোনাইছড়ি, ভরিরমুখ, রোয়াম্ভু, দরদরীসহ অনেকস’ানে এসব সন্ত্রাসীদের আনাগোনা বেড়েছে। সর্বশেষ গত ৭ আগস্ট রাতে লামা ইউপির বইল্যারচর গ্রামে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা স’ানীয় রবি মেম্বারের বাড়ি তল্লাশি করে হুমকি দেয় বলে জানাগেছে। এর তিনদিন আগে সন্দেহভাজন সন্ত্রাসী দলের সদস্য এক যুবককে রবি মেম্বার থানায় সোপর্দ করে। জানা গেছে, এর জের ধরে সন্ত্রাসীরা তার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে হুমকি দিয়ে যায়। বর্ষা মৌসুমে হঠাৎ করে গত কয়েকদিন ধরে এই সন্ত্রাসী দলের চাঁদাবাজি কার্যক্রমে শংকিত হয়ে পড়েছেন লামা-আলীকদম এই দু উপজেলার বাসিন্দারা। সাধারণত এ ধরনের সন্ত্রাসী চক্রের আনাগোনা থাকে শুষ্ক মৌসুমে; তামাক চাষ-বেচা বিক্রিকালীন। বর্ষা মৌসুমে দুই উপজেলার একেবারে লোকালয়ে প্রায়ই রাতে সন্ত্রাসী চাঁদাবাজদের উৎপাতের খবর সচেতন মহলকে ভাবিয়ে তুলেছে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করণে আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণকারী সংস’াগুলোর তৎপরতা বৃদ্ধির দাবি তুলেছেন সন্ত্রাস কবলিত গ্রামবাসীরা। নাম প্রকাশে অনেচ্ছুক আলীকদমের এক জনপ্রতিনিধি জানান, ২৫ জুলাই গভীর রাতে আনসার বাহিনীর পোশাক পরা দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত একদল উপজাতি সন্ত্রাসী তার ঘরে তল্লাশি করে। কিছু না পেয়ে সন্ত্রাসীরা প্রথমে ২ লাখ, পরে ৫০ হাজার টাকা দাবি করে। কয়েক দিনের মধ্যে টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হলে ওই জনপ্রতিনিধিকে প্রাণে মেরে ফেলবে কিংবা অপহরণ করে নিয়ে যাবার হুমকি প্রদর্শন করে। একই রাতে চৈক্ষ্যং ইউপির ৩ নম্বর ওয়ার্ড ভরিরমুখ ফজল কবির থেকে ৮ হাজার টাকা ও তার রাস্তার পাশের দোকান থেকে কয়েক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে যায়। নুর হোসেন নামের আরেক দোকানদার থেকে ৬ হাজার টাকা নেয়। মাহবুব নামের এক বাসিন্দাসহ আরো ১০/১২টি ঘর তল্লাশি করে। একই রাতে খিরা চাষি মনিককুর থেকে ২ লাখ টাকা দাবি করে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। এ ব্যাপারে আলীকদম আইন শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. নাজিমুল হায়দারের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, সন্ত্রাস চাঁদাবাজ সংক্রান্ত বিষয়টি আমি শুনিনি। খোঁজ নিয়ে জানবো। পুলিশ জানায়, তাদের জনবল স্বল্প, তার পরেও সারারাত ধরে বিভিন্ন সড়কের কাছাকাছি গ্রামগুলোর রাত্রিকালীন নিরাপত্তার জন্য ছোট ছোট টিম করে টহল দেয়া হচ্ছে। তাছাড়া পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের মোকাবেলা করার মতো ভারী অস্ত্রও তাদের নেই। এদিকে লামা উপজেলার কয়েকটি স’ানেও একই কায়দায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা তাদের তৎপরতা চালিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। উপজেলার ছোটবমুমুখ এলাকার বাসিন্দা ছৈয়দ আহমেদ ও আব্দুল মালেক জানান, আনসার বাহিনীর মত ইউনিফরম গায়ে ২০/৩০ জনের একদল উপজাতি সশস্ত্র সন্ত্রাসী গত কয়েকদিন ধরে ওই এলাকায় অবস’ান নিয়েছে। এসব সন্ত্রাসীরা স’ানীয়দের থেকে অস্ত্রের মুখে চাঁদা আদায় করে। ছোটবমু হেডম্যান দাবি করেন, এরা সবাই বার্মিজ বাহিনী (আরাকান আর্মি)। তারা কারোর ক্ষতি করবেনা মর্মে হেডম্যানকে জানিয়েছে বলেও সূত্রে জানা গেছে। সর্বশেষ ৭ আগস্ট রাতে লামা ইউপির বইল্যারচর গ্রামে রবি মেম্বারের বাড়িতে ও বাজারের দোকানগুলোতে তল্লাশি চাালিয়ে টাকা ও মুল্যবান দ্রব্যসামগ্রী নিয়ে যায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। জানা গেছে, ১৫/১৬ জনের দলবদ্ধ এসব সন্ত্রাসীদের কাছে আধুনিক অস্ত্র রয়েছে। এরা সবাই ত্রিপুরা ও চাকমা যুবক। এদিকে লামা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিন্টু কুমার সেন, তার এলাকায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের তৎপরতার বিষয়টি উড়িয়ে দিয়ে বলেন, এটা কেবল গুজব। এ ধরনের কোন ঘটনা ঘটেনি। অথচ বিগত কয়েক মাস আগেও লামা উপজেলা মাসিক আইন শঙ্খলা সভায় লামা সদর ইউপি চেয়ারম্যান জানান, সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজির কবল থেকে রক্ষায় তার এলাকার ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তার জন্য পরামর্শ চেয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন। রুপসিপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান সাছিংপ্রু মার্মা জানান, তার ইউনিয়নের নাইক্ষ্যংমুখ এলাকায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের উৎপাতে সেখানকার ব্যবসায়িরা অতীষ্ট হয়ে পড়েছে। সন্ত্রাসীদেরকে চাঁদা না দিলে প্রাণনাশ বা অপহরণের ভয় রয়েছে। ফাঁসিয়াখালী ইউপি চেয়ারম্যান জাকির হোসেন মজুমদার জানান, তার ইউনিয়নের দূর্গম গয়ালমারা এলাকায় একটি অস’ায়ী সেনা ক্যাম্প যতদিন ছিল; ততদিন স’ানীয়রা নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছিল। ক্যাম্পটি না থাকায় বর্তমানে সেখানে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের তৎপরতা পূনরায় শুরু হয়েছে।
এ ব্যাপারে লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার নূর-এ-জান্নাত রুমি বলেন, তিনি বিষয়টি জেনেছেন। এলাকার আইন শৃঙ্খলা ও জনগণের জানমাল রক্ষায় করণীয় বিষয়ে তিনি নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের সাথে পরামর্শক্রমে ব্যবস’া নিবেন বলে জানান। লামা উপজেলা চেয়ারম্যান থোয়াইনু অং চৌধুরী বলেন, সন্ত্রাসীদের বেপরোয়া আনাগোনার খবর শোনা যাচ্ছে। বিষয়টি নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নজরে এনে এদেরকে প্রতিরোধ করা হলে স’ানীয়রা স্বস্তি পাবে। সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ-নির্মুলে সংশ্লিষ্ট মহলগুলো দ্রুত ব্যাবস’া নিবেন; এমনটি আশা করেন বাসিন্দারা।