‘অ’ তে অজগর আর আসে না

মাছুম আহমেদ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘মা বলিতে প্রাণ করে আনচান’। বাংলা ভাষায় ‘মা’ শব্দের যে মাধুর্য ও শক্তি তা এ শব্দের প্রতিরূপ ‘মাম্মি’ বা ‘মম’ এর সঙ্গে তুলনা অমূলক। অন্য সব শব্দের মতো ‘মা’ শব্দটির উচ্চারণ মস্তিষ্ক উৎসারিত হলেও বাংলা ভাষাভাষির কাছে এ শব্দ হৃদয়প্রসূতও। মায়ের ভাষা বলেই হয়ত এ কথাটি জোর দিয়ে বলা সঙ্গত। এ ভাষায় কথা বলার অধিকার স্বতঃস্ফূর্ত হলেও এ অধিকার রক্ত দিয়ে অর্জন করতে হয়েছে বৈকি! এ কারণেই প্রাণের বাংলা ভাষায় মাধুর্যের সঙ্গে দ্রোহও রয়েছে। বিশেষ করে বাংলা ভাষায় মহাপ্রাণ বর্ণ ধ্বনিত হওয়ার সময় একটি সরল জোর সবসময় সঙ্গী হয়। ভাষার অলংকারের সঙ্গে এ জোর যেন আমাদের অর্জিত দ্রোহেরই প্রকাশ!
বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকার অর্জনের সাঁকো বেয়ে এসেছে আমাদের মহান স্বাধীনতা। স্বাধীন ভাষা, স্বাধীন দেশ, স্বাধীন মাতৃভূমি। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রায় সমান বয়েসী আমাদের সংবিধান। এই সংবিধান আমাদের অমূল্য সম্পদ। বিশেষত এর চার মূলনীতি বাংলাদেশের মূল চালিকা শক্তি হিসেবে রাজনীতিকে পথ বাতলে দিয়েছে। যদিও এ পথ নির্মাণে আমাদের বড় ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। স্বাধীনতার স’পতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিজের পরিবারসহ শহীদ হতে হয়েছে। সেই কাঙ্খিত পথ গড়তে গিয়ে পথচ্যুত রাজনীতির যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে অবিরত মূল্য দিতে হয়েছে এবং হচ্ছে। ধর্মকে
রাজনীতির হাতিয়ার বানিয়ে ধর্ম ও রাজনীতি উভয়কেই প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা সেই পদচ্যুত রাজনীতির অন্যতম উদহারণ।

ধর্ম সমাজকে ধরে রাখে। সামাজিক শৃঙ্খলা আর আত্মিক প্রশান্তির জন্য ধর্মের প্রয়োজনীয়তা আবহমানকাল থেকে পরিদৃষ্ট এবং পরিপুষ্ট। যাঁর যাঁর বিশ্বাস মতো ধর্মীয় স্বাধীনতা লাভ, ধর্ম শিক্ষা ও শান্তিপূর্ণভাবে এর চর্চা করার গণতান্ত্রিক অধিকার বাংলাদেশের সংবিধান স্বীকৃত। ধর্মশিক্ষা অবারিত ও নির্বিঘ্ন হওয়াটাই কাম্য। মানুষ তার জ্ঞান, যুক্তি আর প্রজ্ঞা দিয়ে বিবেচনা করে ধর্ম পছন্দ করে তা চর্চা করবে এমনটাই বিবেচ্য। সেখানে সম্প্রদায়িক আচরণের কোনো স’ান নেই। কিন’ সেই কাজটিই সুচারুভাবে সম্পাদনের একটি প্রচেষ্টা আমরা অবলোকন করছি। ‘সবার জন্য শিক্ষা’ স্লোগান সম্বলিত বাংলা বর্ণমালার কোনো কোনো বইতে যখন ‘অ’ তে ”অযু করে নামাজ পড়।”, ‘আ’ তে “আল্লাহর নামে জিকির কর।”, ‘খ’ তে ”খোদার রহমত পাবে তাতে”, কিংবা ‘স’ তে ”সাধু’ অথবা ‘প’ তে ”পূজা-পার্বণ” শেখানোর আয়োজন সম্পন্ন হয় আর রাষ্ট্রযন্ত্র নিশ্চুপ থেকে ‘সমর্থন’ যোগায় তখন কার্যত আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সঙ্গে ভাষাশহীদের ত্যাগও মুখ থুবড়ে পড়ে।
‘অসাম্প্রদায়িকতা’ আমাদের সংবিধানের অন্যতম মূলনীতি। ভাষার ক্ষেত্রেও এ চেতনা সমান্তরাল। মাতৃভাষা শেখায় ও চর্চায় সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিপরীত। শিশুদের বাংলা বর্ণমালার সঙ্গে সাম্প্রদায়িক চেতনার বিষবৃক্ষের চারা রোপণ করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

লেখক: শিক্ষক, দর্শন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।