অসুস্থতার সামাজিক ভিত্তি

মো. হেদায়েত উল্যাহ

মানুষ প্রকৃতির অংশ। একইভাবে সমাজের সদস্য। মানব শরীর একটি প্রাকৃতিক বিষয় তাতে সন্দেহ নেই। জীববিজ্ঞান এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে শরীরবৃত্তিয় বিষয়টি প্রকৃতিগত দিক থেকে গড়ে উঠে। সামাজিক দিক থেকে মানব শরীর যতনা প্রাকৃতিক তার চেয়ে বেশি সামাজিক। মানব শরীর, সুস্থতা, অসুস্থতা প্রভৃতি সামাজিক জীবনের সাথে যুক্ত। তাই আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান কিংবা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায়ও প্রাকৃতিক বিষয়ের সাথে সামাজিক বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। রোগব্যাধির ধরন, প্রকৃতি ও বিস্তারের পিছনে প্রাকৃতিক কারণের সাথে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণও অনুসন্ধান করার বিষয়টি সুদৃঢ় হয়েছে। প্রকৃতিগত ও শরীরবৃত্তিয় দিক থেকে মানব শরীর এক। সেই মানুষ বাংলাদেশী, আমেরিকান, জাপানি কিংবা সুদূর সাহারা মরুভূমি অঞ্চলের হোক। কিন্তু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে সবাই ভিন্ন। এই ভিন্নতা রোগব্যাধির ধরন-প্রকৃতি ও বিস্তারের উপর প্রভাব রাখে প্রবলভাবে। শারীরিক ও প্রকৃতিগত বিষয়ের উপর মানুষের তেমন নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও সামাজিক বিষয় মানুষই তৈরি করেছে তাই মানুষ চাইলে তা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবর্তন করতে পারে। পারে পরিবর্তিত অবস্থা ও প্রেক্ষাপটের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে। রোগব্যাধি কিংবা অসুস্থতাকে আদিকাল থেকে মানুষ তার জ্ঞান-দক্ষতা, চিন্তা-চেতনা কিংবা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছে। মন্ত্র-তন্ত্র দ্বারাও নিষ্কৃতির পথ খুঁজেছে। বর্তমানেও একই ধারা অব্যাহত রয়েছে। এখনো অসুস্থতার কারণ ও সমাধান খুঁজতে বৈজ্ঞানিক, অবৈজ্ঞানিক, প্রথাগত, যৌক্তিক-অযৌক্তিক ইত্যাকার নানা ধরনের আচার প্রচলিত রয়েছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানী লুইস পাস্তুরের ব্যাকটেরিয়া তত্ত্বের আলোকে রোগকে(উরংবধংব) অধ্যয়ন করা হয়ে থাকে। রোগকে একটি জৈবিক বিষয় হিসেবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা হয়। অন্যদিকে অসুস্থতা বা ওষষহবংং বিষয়টি মনস্তাত্ত্বিক বিষয় হিসেবে অধ্যয়ন করা হয়। ব্যক্তি তার অসুস্থতাকে কিভাবে দেখে তা ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণ করাই মনোবিজ্ঞানীদের কাজ। সমাজতাত্ত্বিকরা রোগের চাইতে অসুস্থতা বা ্লঝরপশহবংং বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে জৈবিক বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যাখ্যার পরিবর্তে সামাজিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে থাকে। অসুস্থতা বিষয়টি কিভাবে সমাজের সাথে সম্পৃক্ত তা ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করে। পরিবার, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন তথা সমাজ অসুস্থতাকে কিভাবে দেখে তা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করাই সমাজতাত্ত্বিকদের মূল বিষয়। এ ধরনের কাঠামোতে মনে করা হয় মানব স্বাস্থ্যের সকল বিষয় তার পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাথে সম্পর্কযুক্ত। মানুষের ভৌত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের ওপর স্বাস্থ্য নির্ভরশীল। মানুষের ব্যক্তিগত আচার- আচরণ, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, ব্যক্তিত্ব প্রভৃতি স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে। একইভাবে আন্তঃব্যক্তিক বিষয় যেমন- অন্যান্য মানুষের সাথে সম্পর্ক, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক বিষয় যেমন- নিয়মনীতিমালা, পলিসি, কাঠামোও একইভাবে স্বাস্থ্যের সাথে যুক্ত। দলগত মূল্যবোধ, সরকারি-বেসরকারি পলিসি, আইন প্রভৃতিও মানব স্বাস্থ্যের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত বলে মনে করা হয়ে থাকে। মানব স্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিষয় ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির বিস্তার যে ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে তা জোর দিয়ে বলা যায়। পৃথিবীর প্রাচীন কাল থেকে যদি আমরা মানব শরীর, রোগব্যাধির ধরন-প্রকৃতি ও বিস্তারের দিকে লক্ষ্য করি তাহলে এটি স্পষ্ট যে সময়ের সাথে এসবের পরিবর্তন হয়েছে। এসেছে নতুন রোগব্যাধি, বেড়েছে স্বাস্থ্য সচেতনতা। ভারতীয় উপমহাদেশ কিংবা বাংলাদেশেও একই ধারা অব্যাহত আছে। আজ থেকে দুই দশক আগেও বাংলাদেশে রোগব্যাধি, স্বাস্থ্য সচেতনতা, চিকিৎসাসেবা, স্বাস্থ্যসেবা ও রোগব্যাধি সম্পর্কে প্রচলিত মূল্যবোধ যেমনটি ছিল বর্তমানে তেমনটি নেই। বাংলাদেশে এখন ডায়রিয়া, কলেরা, গুটি বসন্তের মত সংক্রমিত রোগের প্রাদুর্ভাব অনেকটা কমেছে একইভাবে বাড়ছে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপের মত অসংক্রমিত রোগের বিস্তার।
প্রশ্ন হতে পারে মানুষ এখন স্বাস্থ্য সচেতন হয়েছে কিন্তু রোগব্যাধি কিংবা অসুস্থতা কি কমেছে? আপনিও সহজে উত্তর দেবেন ‘না’। গ্রাম্য বৃদ্ধদের ভাষায় ‘এখন ডাক্তারও বেশি রোগও বেশি’। ডাক্তার বেশি তা ঠিক। রোগ-ব্যাধিও বেশি তাও সঠিক। আবার স্বাস্থ্য সচেতনতাও বেড়েছে তাও ঠিক। তিনের সমন্বয় করে বললে সব কিছুতেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে শিক্ষার হার বেড়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সমৃদ্ধি এসেছে। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। তথ্য ও যোগাযোগের অবাধ প্রবাহে বিশ্বের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ বেড়েছে। তাই স্বাস্থ্য সচেতনতা ও স্বাস্থ্যসেবায় উন্নতি হওয়া স্বাভাবিক। আগে বাংলাদেশের মানুষ না খাওয়ার কারণে মারা যেত এখন খাওয়ায় মারা যায়! ব্যাখ্যা করে বললে দরিদ্র দেশের বহু মানুষ ঠিক মত খেতে পারতো না। অতিরিক্ত পরিশ্রম ও অপুষ্টি জনিত রোগব্যাধিতে মানুষ মারা যেত। এখন বেশি খাওয়ার কারণে কিংবা খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের ফলেও শারীরিক পরিশ্রম না করার কারণে মানুষ মারা যাচ্ছে অনেক বেশি।
বিশ্ব খ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ‘ল্যানসেট’ এর হিসেবে বিশ্বে অপুষ্টিজনিত কারণে যে পরিমাণ মানুষ মারা যায় তার তিনগুণ বেশি মানুষ মারা যায় অতিরিক্ত খেয়ে স্থূলতার কারণে। সংখ্যা হিসেবে বিশ্বব্যাপী শত কোটি ছাড়িয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাকিঞ্জি গ্লোবাল ইনস্টিটিউটের গবেষণায় জানা যায় সারা বিশ্বে ২১০ কোটি মানুষ স্থূলকায় বা অতিরিক্ত ওজনের যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৩০ ভাগ। ২০৩০ সালে প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের অর্ধেকই হবে স্থূলকায়। অতিরিক্ত ওজনের কারণে বিভিন্ন রোগে মারা যায় বিশ্বের মোট মৃত্যুর ৫ শতাংশ মানুষ। সমপ্রতি বিশ্বের ১৬৮ দেশের ২০ লক্ষ মানুষের উপর পরিচালিত ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ জার্নালের এক জরিপে বলা হয়েছে বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ মানুষ শারীরিকভাবে সক্রিয় না হওয়ার কারণে অকালে বা স্বাভাবিক বয়স হওয়ার আগেই মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার এ হার ৩৩%। এখানে একটি কথা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো আগে মানুষ চাইলেও প্রয়োজনীয় খাবার খেতে পারতো না। দারিদ্র্যেতার জন্য অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হত সে অনুযায়ী পুষ্টির চাহিদা মেটাতে পারতো না। এখন যে এটি নেই তা কিন্তু নয়। তবে এখন এ ধারা অনেকটা কমে এসেছে। আগে মানুষের এ সীমাবদ্ধতার জন্য তার ইচ্ছা-অনিচ্ছা অনেকাংশে মূল্যহীন ছিল। কিন্তু এখন মানুষ চাইলে কম খেতে পারে কিংবা খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে পারে। কিছুটা শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারে অনায়াসেই। আর ধূমপানের অভ্যাস থাকলে ত্যাগ করা অসাধ্য কিছু নয়। আমাদের ইচ্ছাশক্তির ওপরই পুরো বিষয় নির্ভর করে। পরিবেশ-পরিস্থিতি অনেকটাই নিজের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে। তাই রোগ হওয়ার পর প্রতিকারের চাইতে আচরণিক পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা তৈরি করে স্বাস্থ্য ভালো রাখাই অধিকতর সহজ ও যুক্তিযুক্ত।
লেখক : বিভাগীয় প্রধান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, এনায়েতবাজার মহিলা কলেজ