অভিভাবক হারালো চট্টগ্রাম

রুশো মাহমুদ
hfg

এই মৃত্যু অপূরণীয় ক্ষতি। পুরো নগরী বিষণ্ন আর শোকে কাতর। চলে যাওয়া স্বাভাবিক, প্রকৃতির নিয়ম তাই। কিন’ তিনি তো বিশেষ একজন। যাকে চট্টগ্রাম তৈরি করেছে তিল তিল করে। যিনি নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন চট্টগ্রামের জন্য। এই শহর আর এই ব্যক্তি যেন এক অভিন্ন সত্তার। যার ধ্যানজ্ঞান সবটুকু ছিল চট্টগ্রাম। হৃদয়জুড়ে কেবলই চট্টগ্রাম। তিনি নেই! এই শূন্যস’ান আমরা পূরণ করবো কী দিয়ে?
মহিউদ্দিন চৌধুরী একজন ফুলটাইম পলিটিশিয়ান। রাজনীতির বাইরে তার দ্বিতীয় কোন চিন্তা ছিল না। এখন তো সব বিজনেসম্যান কাম পলিটিশিয়ান। ফুলটাইমাররা প্রায় বিরল হতে চলেছে। আপাদমস্তক এই রাজনীতিবিদের ভাবনা জগতের সবটা জুড়ে ছিল দেশ-দল আর চট্টগ্রাম। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড আর পঁচাত্তরের পটপরিবর্তন তিনি নীরবে মেনে নেননি। তিনি হয়েছিলেন সশস্ত্র প্রতিবাদী। এই অকুতোভয় দেশপ্রেমিক বীরযোদ্ধার অসীম সাহসের পরিচয় মেলে তখন। এই সাহস তাঁর স্বভাবজাত, তিনি তো একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা।
আশির দশকের শুরুতে হুলিয়া মাথায় নিয়ে চট্টগ্রামে সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও দিশেহারা নগর আওয়ামী লীগ গুছিয়েছিলেন এক অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতায়। আশি থেকে নব্বই দশকে এই নগরের সকল আন্দোলন-সংগ্রাম, সামরিক ও স্বৈরাচারবিরোধী কর্মসূচিতে কখনো নেপথ্যে, কখনো প্রকাশ্যে মূল নিয়ামক শক্তি ছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী।
আমৃত্যু বঙ্গবন্ধু মুজিবের রাজনীতি করেছেন। জেল, জুলুম আর হুলিয়া তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে তাঁকে এক মুহূর্তের জন্যও টলাতে পারেনি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ভিন্নমতের সাথে সহঅবস’ান ও সহমর্মিতা আর সহযোগিতার মূর্ত প্রতীক ছিলেন তিনি। ছাত্ররাজনীতি থেকে শ্রমিক রাজনীতি করতে করতে একজন মহিউদ্দিন হয়ে উঠেন ‘প্রিয় মহিউদ্দিন ভাই’। ৯১-এর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী বিধ্বস্ত উপকূলে তাঁর অতিমানবীয় ভূমিকা চট্টগ্রামবাসী কখনোই ভুলবে না। দাফন-কাফন থেকে শুরু করে উপদ্রুত এলাকার লোকদের জন্য খাওয়ানোর ব্যবস’া করা, এমনকি উপদ্রুত মানুষের চিকিৎসায় মুসলিম হলে ফিল্ড হাসপাতাল স’াপন করেছিলেন তিনি। অথচ তিনি তখন ক্ষমতাসীন দলের কেউ নন। স্রেফ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। এরকম আরো অনেকবার সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ একজন সিজন্ড নেতা ছিলেন এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম এ আজিজ এবং জহুর আহমদ চৌধুরী আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে বৃহত্তর চট্টগ্রামের আপামর জনগণের কাছে নিয়ে গেছেন। সেই গণস্রোতধারায় বেগ সঞ্চার করেছেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। তাই চট্টগ্রামের মানুষ তাকে ‘চট্টলবীর’ উপাধি দিয়েছে। মানুষের ভালোবাসায় ক্রমেই তিনি পরিণত হন জননেতায়। মানুষের পাশে থাকতে পারায় তাঁর ছিল প্রশান্তি। আর মানুষও তার প্রয়োজনে ছুটে যেত প্রিয় নেতার কাছে। তাঁর দ্বার অবারিত ছিল সবার জন্য।
এই নগরীতে কোথায় নেই মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছোঁয়া। টানা সতের বছর নির্বাচিত মেয়র ছিলেন এই নেতা। কতটা গভীর ভালবাসায় জড়িয়ে ছিলেন এই নগরের সাথে, এই নগরবাসীর সাথে তা পরিমাপের বাইরে। তিনি কখনো চট্টগ্রাম ছাড়তে চাননি। এই শহর ছাড়তে হবে বলে তুচ্ছ করেছেন মন্ত্রিত্ব। হতে চাননি কেন্দ্রীয় নেতাও। থাকতে চেয়েছেন শুধুই এই নগরের একজন রাজনীতিক হয়ে, অভিভাবক হয়ে। নিজ সরকারের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়েও বন্দর রক্ষা, গভীর সমুদ্রবন্দর স’াপনসহ চট্টগ্রামের স্বার্থে বারবার গর্জে উঠেছিলেন তিনি। সত্যিকারের রাজনীতি যে জনসেবা তার প্রমাণ মহিউদ্দিন চৌধুরী।
আমরা প্রকৃত অর্থে একজন অভিভাবক হারালাম। দেশ হারালো একজন দেশপ্রেমিক নেতা। এরকম নেতার জন্ম বারবার হয় না। তিনি ছিলেন আমাদের সময়ের সাহসী সন্তান। এই ক্ষতি সহজে পূরণ হওয়ার নয়।