অবাক করা ময়না

বিপুল বড়ুয়া

সবাই ভয়ে ভয়ে আছে। সবার চোখে মুখে দারুণ উৎকণ্ঠা। জানি না কখন কী হয়। মুক্তিযোদ্ধারা কোমর বেঁধে যুদ্ধে নেমেছে। পাকিস্তানি আর্মিরা দেশীয় দোসর রাজাকারদের নিয়ে আজ এদিকে তো কাল ওদিকে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে।
মামাবাড়িতে এসে ময়না ভাবে শহরের মতো এই গাঁও গেরামও মোটেই নিরাপদ নয়।
মামাদের পই পই করে মানা-‘ময়না ইশকুলের মাঠের দিকে যাসনে। সবার চোখে পড়বি। গাঁয়ে নতুন ছেলেপিলে দেখে কে কখন মতলব চেয়ারম্যানের কানে ফুসফাস কথা তোলবে-‘গাঁয়ে অচেনা ছেলে চেয়ারম্যান সাব মনে হয় মুক্তি…।’
ময়না সেই হতে ঘরবন্দি। দলুমুন্সি হাটে তো যাওয়াই হয় না। পশ্চিমের সাহেবের হাটখোলায়ও যাওয়া বারণ। চেয়ারম্যান লোক লাগিয়েছে চারদিকে। গাঁয়ের ছেলেপুলেরা কে কোথায় যায় না যায়-খবর নিচ্ছে। কাউকে বাড়ি-হাটে-ইশকুল ঘাটায় দেখা গেলো কি গেলো না-তার হিসাব নিকেশ হচ্ছে।
মামাবাড়ির চারপাশে এতসব। কিন্তু কি করা। অত ভয়ংকর সময়ের ভেতর শহরের বাসা ছেড়ে ময়নারা মামাবাড়ি এসে উঠেছে।
কিন্তু বিপদ এখানে আরো বাড়ন্ত। মতলব চেয়ারম্যান শান্তি কমিটি করেছে, রাজাকার বাহিনী গঠন করেছে। তত্ত্ব তালাশ নিচ্ছে কারা পাকিস্তানের বিপক্ষে কথা বলছে, কারা মুক্তিযোদ্ধাদের বাহ্বা দিচ্ছে; কারা আকাশবাণীর খবর সংবাদ পরিক্রমা শুনছে, কারা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শুনছে-সব খবরাখবর নিচ্ছে চেয়ারম্যান ব্যাটা।
বাড়ির সবারও চোখ ময়নার ওপর। সবার এক কথা। ‘ময়না বাড়ি হতে বের হবে না। গেরামে তোমাকে কেউ চেনে না-কখন কার কানে কে কোন কথা তুলবে বলা যায় না।’
বোধির ভিটাতেও আর ক’দিন থেকে খেলা জমছে না।
বাদল, সুকান্ত, অজয় আসে-আসে মিয়া বাড়ির তোহা, জগলুও। সবার মুখে একই কথা। দেশে যুদ্ধ লেগে গেছে। মুক্তিবাহিনী জোর কদমে লড়ে যাচ্ছে-গোহারা হেরে চলেছে পাক আর্মি। তাই এখন গভীর ষড়যন্ত্র করে শহরে-গাঁও গেরামে শান্তি কমিটি, আলবদর, রাজাকার বাহিনী গঠন করে নিরপরাধ জনগণকে বাঁচতে দিচ্ছে না-চারদিক জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে-মানুষের চোখের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে।
ময়না ভাবে-অনেক অনেক কিছু ভাবে। পাকিস্তানি আর্মির এই ধ্বংসযজ্ঞ-হত্যা-নির্যাতন-মুক্তিযোদ্ধাদের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়া সব সব নিয়ে অনেক কিছু ভাবে।
সারাদিন মামাবাড়িতে এঘর-ওঘর করে। কোথায়ও বের হয় না। চুপচাপ সময় কাটে ময়নার।
ময়না কিন্তু ঠিকই টের পায়-তার ভেতরে ভেতরে কী এক জ্বালা। তাকে কিসের তাড়া দেয়। সে যেনো ঘুমিয়ে আছে। সুনসান ঘুম আঁকড়ে ধরে আছে যেনো ময়নাকে।
ময়নার যেনো ঘোর কাটে না। সে যেনো পড়ে থাকে পচা শেওলা হয়ে। সে যেনো দমবদ্ধ হয়ে পড়ে থাকে। গলায় যেনো কার হাত চাপা। জগদ্দল এক পাথর যেনো চেপে বসে ময়নার বুকে। নিজকে যেনো বড়ো অচেনা মনে হয়।
সন্ধ্যায় মামাদের বাইরের কাচারিতে ম্যালা লোক চুপি চুপি আসে। চা নাস্তা হয়। মিনু মামাকে নিয়ে সব্বাই জেঁকে বসে। এটা সেটা যুদ্ধের খবরাখবর সবাই বলাবলি করে। ওসবের সত্যতা কেউ বাছ বিচার করে না।
সবার শুনতে ভালো লাগে মুক্তিযোদ্ধাদের অপারেশনের কথা-পাক আর্মিকে নাস্তানাবুদ করার কথা-দেশি লিকলিকে রাজাকারদের হাতুড়ে বন্দুক ফেলে পালানোর কথা।
ময়নাও আশপাশে থেকে বাদলকে নিয়ে শুনে অতসব ভয়ঙ্কর মজার কথা। নিজেও যেনো চায় কিছু একটা করতে দেশের জন্যে।
ময়নার দ্রুত মনে পড়ে আমতলী মুক্তিবাহিনী ক্যাম্প কমান্ডার জোবায়ের ভাইয়ের কথা। কী দারুণ কথা বলেন, ভার্সিটি পড়া জোবায়ের ভাই। ‘আমরা যে যেখানে থাকি-সেখান থেকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি হানাদারদের তাড়িয়ে এ দেশকে স্বাধীন করতে হবে…।’
কিন্তু কী করবে ময়না? একবার অনেক ভাবার পর ঠিক করে সে একটা কিছু করবে। একবার ঠিক ঠিক বাবলুর সাথে গিয়ে আমতলী ক্যাম্পে জোবায়ের ভাইয়ের সাথে অ-নে-ক কথা বলে আসে ময়না।
ময়না বোঝায় জোবায়ের ভাইকে-মতলব চেয়ারম্যানের কথা-চেয়ারম্যানের রাজাকার বাহিনী করার কথা-আতাপুর ইশকুলে মজাসে ক্যাম্প করে গাঁয়ে ত্রাস সৃষ্টির কথা।
কমান্ডার জোবায়েরও বোঝে। ঐ পাকিস্তানি দালাল চেয়ারম্যানকে খতম করা গেলে গ্রামে আর শত্রু থাকবে না-কোথায় যাবে রাজাকার পাক আর্মিও আর এ মুখো হবে না।
ময়নার এক কথা। ‘দেখো, জুবায়ের ভাই-মাত্র দুটো গ্রেনেড দিয়ে আমি ঠিকই উড়িয়ে দেবো মতলব চেয়ারম্যানকে। তারপর সবাই শান্তিতে থাকবো।
কমান্ডার জোবায়ের ইতিউতি করে ‘ময়না তুমি এখানে নূতন। দেখো এটা বড়ো দুঃসাহসের কাজ।’
ময়না হাসে। ‘জুবায়ের ভাই এটাই তো সুবিধা। আমাকে কেউ চেনে না। রাতে তো চেয়ারম্যান রাজাকারদের নিয়ে বাইরের বৈঠকখানায় শলাপরামর্শ করে। ঠিক তখনি দুটো গ্রেনেড চার্জ করে উড়িয়ে দেবো চেয়ারম্যানকে দেখেন।’
কদিন বেশ হাঁসফাঁস করে ময়না। মা অবাক হয়। মামারা থতমত খায়। ময়না হেসে সব সামলে নেয়। কী ব্যাপার?
এক দুবার আমতলী ক্যাম্পে গিয়ে জুবায়ের ভাইয়ের পরামর্শ নেয়। চুপি চুপি দুটো আস্ত গ্রেনেড এনে ছাদের কুঠুরিতে লুকিয়ে রাখে।
বাবলুর সাথে দূর হতে দেখে আসে চেয়ারম্যানের বৈঠকখানা। বাবলুও সতর্ক করে ময়নাকে। ময়নার সেই গোঁ-‘আমি একাই পারবো গ্রেনেড চার্জ করতে।’
তা-কদিন পরেই ঘটে যায় ঘটনাটা।
মাঝ রাতে পর পর দুদুটো গ্রেনেড চার্জের বিকট শব্দে সারা গাঁয়ের লোকের ঘুম ভেঙে যায়। কী হলো-কী হলো।
সবাই আতঙ্কে চুপসে আছে।
চারদিকে হৈ-চৈ। দক্ষযজ্ঞ ব্যাপার। মুক্তিরা গ্রেনেড চার্জ করে উড়িয়ে দিয়েছে মতলব চেয়ারম্যানের বৈঠকখানা।
সকালে দেখা যায় চেয়ারম্যানের ছিন্নভিন্ন লাশ-বেশ ক জন রাজাকারও মরে পড়ে আছে।
কে জানে? কেউ জানে না। তবে চুপচাপ থাকা ময়না জানে-তার ভেতরে থাকা আর এক তেজি ময়না-এবার আরও বড়ো যুদ্ধে নামার জন্য দ্রুত নিজকে তৈরি করছে।