নাসের রহমানের ‘রুপোলি মেঘের চাঁদ’ গ্রন্থের প্রকাশনা উৎসব

অবক্ষয় রোধে সৃজনশীল চর্চার বিকল্প নেই : মেয়র

কথাসাহিত্যিক নাসের রহমানের ‘রুপোলি মেঘের চাঁদ’ গল্পগ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনসহ অতিথিবৃন্দ
কথাসাহিত্যিক নাসের রহমানের ‘রুপোলি মেঘের চাঁদ’ গল্পগ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনসহ অতিথিবৃন্দ

সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেছেন, আমাদের বর্তমান সমাজ ব্যবস’ায় যে গোঁড়ামি, ধর্মান্ধতা, কূপমণ্ডুকতা ও কুসংস্কার বিরাজ করছে এসব থেকে বেরিয়ে আসতে হলে অবশ্যই শুদ্ধ সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার কোন বিকল্প নেই। তিনি আরও বলেন, আমাদের কাছ থেকে দিন দিন নীতি, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ হারিয়ে যাচ্ছে। নীতি নৈতিকতার অবক্ষয়ের এ সময়ে আমাদের বেশি বেশি সৃষ্টিশীল ও সৃজনশীলতা চর্চা করতে হবে। এলক্ষ্যে লালন করতে হবে সৃজনশীল মানুষদের। তিনি বলেন, যারা সাহিত্য চর্চা করেন তারা সৃষ্টিশীল ও সৃজনশীলতাকে ভালোবাসেন। কথাসাহিত্যিক নাসের রহমান এমনই এক সৃজনশীল মানুষ যিনি ছাত্রজীবন থেকে লেখালেখি করছেন এবং এখনও লেখালেখিতে নিবিষ্ঠ আছেন। তাঁর লেখায় আছে মায়াবী প্রকৃতি, রক্তে রাঙানো ভাষা আন্দোলন, গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ, প্রাণ মাতানো উৎসব, পার্বণ, স্বদেশপ্রেম, সম্ভাবনা আর স্বপ্নময় জীবন। তিনি পরিবার ও পারিপার্শ্বিক খুব সাধারণ ঘটনাকে অসাধারণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি কর্মজীবনে যেমন সফল তেমন সাহিত্যে ও পারিবারিক জীবনেও সফল মানুষ। আলোকিত সমাজ ও প্রজন্ম নির্মাণে নাসের রহমানের লেখনি ভূমিকা রাখবে।
মেয়র বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। কিন’ দুঃখের বিষয়, এখনও আমরা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে লালন করতে হবে।
২৬ নভেম্বর বিকেল সাড়ে ৪ টায় ফুলকি’র এ কে খান স্মৃতি মিলনায়তনে কথাসাহিত্যিক নাসের রহমান রচিত ছোটদের গল্পগ্রন’ ‘রুপোলি মেঘের চাঁদ’ এর প্রকাশনা উৎসবে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।
দৈনিক আজাদী’র সাহিত্য সম্পাদক কবি-সাংবাদিক অরুণ দাশগুপ্ত’র সভাপতিত্বে প্রকাশনা উৎসবে বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে আলোচক ছিলেন শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক ড. আনোয়ারা আলম, দৈনিক বীর চট্টগ্রাম মঞ্চ সম্পাদক সৈয়দ উমর ফারুক ও দৈনিক আজাদী’র সহযোগী সম্পাদক কবি-শিশুসাহিত্যিক রাশেদ রউফ।
অনুষ্ঠানে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন আরও বলেন, বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে বই পড়ার প্রবণতা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। তারা পড়ার চেয়ে দেখতেই অভ্যস্ত। তিনি বলেন, চিন্তার পরিধি বাড়াতে পাঠের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই কূপমণ্ডুকতা ও সংকীর্ণতা দূর হবে। আজ আমরা ক্রমেই যান্ত্রিকতার দিকে ধাবিত হচ্ছি। ফলে আমাদের মধ্যে নীতি, নৈতিকতা ক্রমেই লোপ পাচ্ছে। ‘মানুষ মানুষের জন্য’ এ মূল্যবোধ হারিয়ে যেতে বসেছে। আজ আমরা সন্তানদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার করার চেষ্টায় লিপ্ত। কিন’ মানুষ হওয়ার জন্য প্রজন্মকে তৈরি করছি না। নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন আগামী প্রজন্ম তৈরি করতে পারলেই এটাই হবে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় অর্জন।
বিশেষ অতিথি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, নাসের রহমানকে আমরা সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যাংকার হিসেবে দেখেছি। কিন’ তাঁর ভেতরে রয়েছে অসাধারণ ব্যক্তি মানস। সৌন্দর্যকে আবিস্কার করতে যে ত্যাগ প্রয়োজন সেটা রয়েছে তাঁর মধ্যে। তিনি এতগুলো কর্মের মধ্যেও সুন্দর সমাজ, দেশ ও প্রজন্মের জন্য চিন্তা করেন। আবেগের সাথে মানুষের জীবনবোধের সমন্বয় করা সাহিত্যিকদের কাজ। নাসের রহমান এ কাজটি সুচারুভাবে করতে পেরেছেন।
সভাপতি অরুণ দাশগুপ্ত বলেন, আজকের শিশুদের মধ্যে কল্পনা নেই। আমাদেরকে ছোটবেলায় দাদীরা রূপকথার গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়াতেন। তা আমাদের ভাবনার জগতে নিয়ে যেতো। নাসের রহমানের মধ্যে চিন্তার নতুন জগৎ রয়েছে। তিনি ঠিকই ধরতে পেরেছেন আমাদের সন্তানেরা শৈশব-কৈশোরকে অপচয় করছে। এর বিরুদ্ধে নাসের রহমানের লেখনি প্রতিবাদ শাণিত। লেখক তার সমাজ, পরিবেশকে অগ্রাহ্য করতে পারে না। তিনিই ভালো লেখক যিনি সমাজকে নিরীক্ষণ করতে পারেন এবং তা প্রকাশ করতে পারেন। নাসের রহমান কিশোর মনস্তত্ত্ব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
চট্টগ্রাম মঞ্চ সম্পাদক সৈয়দ উমর ফারুক বলেন, নাসের রহমান তাঁর লেখনির মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে আলোকিত করেছেন। কবি আলম পরিবারের সান্নিধ্য পেয়েছেন তিনি। ছাত্রজীবন থেকে তিনি প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। ছোটবেলায় যে পরিবেশে বড় হয়েছেন, তা নাসের রহমানের সাহিত্য মনন গঠনে ভূমিকা রেখেছে। তাঁর লেখা শিশু-কিশোরদের নতুন করে ভাবনার জগত উন্মোচন করেছে।
শিক্ষাবিদ-প্রাবন্ধিক ড. আনোয়ারা আলম বলেন, শিশুসুলভ না হলে শিশুদের জন্য লেখা অনেক কঠিন। তার ভিতরে একজন শিশুসুলভ মানুষ রয়েছে। তিনি দক্ষতার সাথে শিশুদের প্রতি মমত্ববোধ, ভালোবাসা জাগিয়ে তুলেছেন। ভাষা, কাব্যিক সৌন্দর্য, চিত্রকল্প ও ব্যঞ্জনা চমৎকারভাবে উপস’াপিত হয়েছে তার লেখায়। প্রকাশ পেয়েছে পরিবেশের প্রতি ভালোবাসা।
কবি-শিশুসাহিত্যিক রাশেদ রউফ বলেন, শিশুসাহিত্যে নাসের রহমানের আগমন হঠাৎ নয়। তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। তাঁর গল্পে নতুনত্ব আছে। আছে কল্পনার জগত। শিশু-কিশোরদের কাছে লেখকের যে বার্তা পৌঁছে দেয়া দায়িত্ব, রূপোলি মেঘের চাঁদ গ্রনে’র মাধ্যমে নাসের রহমান সে বার্তা পৌঁছে দিতে পেরেছেন।
গ্রনে’র লেখক নাসের রহমান অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, আমি মনের আনন্দে লিখি। সমাজের যা কিছু আমার চোখে ভাসে সেগুলোই আমি লেখনির মাধ্যমে প্রকাশ করার চেষ্টা করি। আমি সাহিত্যের আঙ্গিক ও বিশ্লেষণ নিয়ে আমার চিন্তাকে প্রসারিত করিনি। আমি শহুরে শিশুদের গ্রামের দুরন্তপনার মাধ্যমে বেড়ে ওঠা শিশুদের নিয়ে ভাবতে শেখানোর চেষ্টা করেছি।
আবৃত্তিকার মিলি চৌধুরী সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রকাশনা উৎসব উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক শিশুসাহিত্যিক অরুণ শীল।
এতে অন্যদের মধ্যে উপসি’ত ছিলেন, প্রকাশনা উদযাপন পরিষদের সদস্য সচিব সাংবাদিক আরিফ রায়হান, ব্যাংকার্স ক্লাব চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার উদ্দিন, বেতার ব্যক্তিত্ব ফজল হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা ও ছড়াকার নূর মোহাম্মদ রফিক, শিশুসাহিত্যিক উৎপলকান্তি বড়-য়া, অধ্যাপক সুপ্রতীম বড়-য়া, শিশুসাহিত্যিক আবুল কালাম বেলাল, ছড়াকার অনিন্দ্য বড়-য়া, শিশুসাহিত্যিক আজিজ রাহমান, গল্পকার মিলন বনিক, লেখক ইফতেখার মারুফ, ফারজানা রহমান শিমু, কোহিনুর আক্তার, ফেরদৌস আরা রীনু, সীমা কুণ্ডু, রুনা তাসমিনা, জান্নাতুল ফেরদৌস সোনিয়া, এম কামাল উদ্দিন। লেখকের জীবনী পাঠ করেন ব্যাংকার-আবৃত্তিশিল্পী মসরুর হোসেন। গল্প থেকে পাঠ করেন লেখকের দুই সন্তান প্রাচুর্য রহমান ও প্রাজ্ঞ রহমান। বিজ্ঞপ্তি

আপনার মন্তব্য লিখুন