অপুর গ্রামের দিনগুলো

সোহেল বীর

রসুলপুর গ্রামে অপুর প্রথম আসা। গল্পের বইয়ে অনেক বার গ্রামের কথা পড়েছে সে। কিন’ এবারই প্রথম গ্রাম দেখা। রসুলপুর গ্রামটা সত্যিই অনেক সুন্দর। উন্মুক্ত বাতাস, কোলাহলমুক্ত পরিবেশ যেন গল্পে পড়া সেই গ্রামগুলোর মতো। কিশোরদের দস্যিপনার কথা পড়ে তারও কতবার দস্যি হতে ইচ্ছে হয়েছে তার কোনো শেষ নেই। রসুলপুর গ্রাম যেন তাকে সবকিছু মনে করিয়ে দিচ্ছে।

জমিদার বাড়ির আত্মীয় তারা। বাবাকে বারবার বলার পর তিনি অপুদেরকে গ্রাম দেখাতে নিয়ে এসেছেন। প্রথম দিনেই গ্রামের জাফর আর মহিনের সাথে পরিচয় হয়েছে। তারা অপুর সমবয়সী। তাদেরকে পেয়ে খুব ভালো লাগল তার। সে বাবার কাছে গিয়ে মহিন আর জাফরের কথা বলে। সে আরও বলে ওদের সাথে এ ক’দিন বেড়াবে। বাবা বলেন, ‘আচ্ছা ঠিক আছে। তবে সাবধান, দূরে কোথাও যেও না কিন’।’

মহিনরা গ্রামের আর দশটা ছেলের মতো না। তারা একটু ডানপিটে স্বভাবের হলেও বড়দের দেখলেই সালাম দেয়, সম্মান দিয়ে কথা বলে। নিয়মিত স্কুলে যায়। এজন্যই ওদের কেউ কিছু বলে না।

এখন গ্রীষ্মকালীন ছুটি চলছে। পুকুরে দৌড়ঝাঁপ, গাছে উঠে আম পেড়ে খাওয়া আর নানা রকম খেলাধুলা করেই তাদের সময় যাচ্ছে। মহিন আর জাফরই নয়, তাদের দলে আরও অনেকে আছে- রিপন, রবিন, মারুফ এবং টুটুল।

ক্রিকেট অপুর প্রিয় খেলা। মহিনরাও ক্রিকেট খেলতে অনেক ভালোবাসে। বিকেলে মহিনদের সাথে অপুও মাঠে যায়। মহিন আর জাফরের সাথে খেলার মাঝে অপুর অনেক কথা হয়। জাফর বলে, ‘অপু, তুমি কি সাঁতার পারো?’ অপুু বলে, ‘না।’ জাফর বলে, আমাদের সাথে কাল পুকুরে যাবে সাঁতার শিখতে? অপুর খুব ইচ্ছে সাঁতার শেখার। ‘কিন’ একদিনে কি আর সাঁতার শেখা যায়?’ অপু জানতে চায়। জাফর বলে, ‘যত দিন গ্রামে আছ প্রতিদিন আমাদের সাথে পুকুরে গেলে তুমিও সাঁতার শিখতে পারবে। সাঁতার শেখা একদম সোজা।’ ক্রিকেট খেলা শেষে সবাই বাড়ি চলে আসে।

পরদিন সকালের নাশতা করে অপু ওদের সাথে পুকুরে যায়। কূলে দাঁড়িয়ে থাকে। পানিতে নামতে ভয় পায়। মহিন আর জাফরদের সাথে আজ আরও একজন যোগ দিয়েছে। জাফরের বড় ভাই বক্কর। বক্করের কাছে পাড়ার সবাই সাঁতার শিখেছে। অপুর সাঁতার শেখার কথা ভেবেই জাফর তার ভাইকে ডেকে এনেছে।

বক্কর অপুকে সাথে নিয়ে পানিতে নেমে যায়। এই প্রথম পুকুরে নামল অপু। অপু বক্করকে ধরে পা ঝাঁকাতে থাকে। পানি দেখে অপুর খুব ভয় করে। চিৎকার শুরু করে দেয়। অপুকে কূলে নিয়ে আসা হয়। এ দিন আর বেশিক্ষণ সাঁতার শেখা হলো না।

পরের দিন। অপুকে আরো ভালো করে সাঁতার শেখার কলাকৌশল বলে দেয় বক্কর। অপু এবার একাই পানিতে নেমে গেল। অপুর পেটের নিচে হাত দিয়ে তাকে পানিতে ভাসানোর চেষ্টা করল বক্কর। সাথে জাফর ও মহিন আছে। ওদিকে অন্যরা ইচ্ছে মতো সাঁতার দিয়ে এদিক-সেদিক ছুটে বেড়াচ্ছে। অন্যদের সাঁতরানো দেখে অপুর খুব ভালো লাগে। অপু মনে মনে ভাবে সেও এবার সাঁতার শিখে ফেলবে। সাঁতার শেখার কথা ভাবতেই সে শিহরিত হয়।

সাঁতার শিখতে গিয়ে আজ একটু পানি খেয়ে ফেলল অপু। হালকা কাঁশিও হয়। মহিন বলে, ‘আরে এইটা তো কিচ্ছু না, জীবনে কত পানি খাইছি!’ মহিনের কথা শুনে জাফর আর বক্কর মনে মনে হাসে। ‘তবে এটা ঠিক, সাঁতার শিখতে হলে একটু আধটু পানি পেটে ঢুকে যায়’- মুরব্বিদের মতো করে বলে বক্কর।

এক সপ্তাহ পর। অপু বেশ সাঁতার শিখে ফেলেছে। এখন সে একাই সাঁতার কাটতে পারে। এদিকে অপুর সাঁতার শেখার বিষয়টা তার পরিবারের কেউ জানে না। বিকেলে মাঠে ঘুড়ি ওড়াতে গেল অপু। এভাবে কখনো একা একা সে ঘুড়ি ওড়ায়নি। কত রকমের ঘুড়ি! জাফরদের কাছে এটা খুব সাধারণ ব্যাপার হলেও অপুর কাছে এটা অসাধারণ। গ্রামের এই উন্মুক্ত আকাশ, চারিদিকে সবুজের সমারোহ, হৈ-হুল্লোড় শহরে কোথায় খুজে পাবে সে? নিজে নিজেই ভাবতে থাকে।

দেখতে দেখতে দুই সপ্তাহ হয়ে গেল। আর দুই দিন পর অপুরা আবার শহরে চলে যাবে। শহরে যাওয়ার কথা অপুর বাবা অপুকে ডেকে বললেন। অপুর মা পাশে ছিলেন। কথাটা শুনে অপুর খুব খারাপ লাগল। গ্রামের এই স্নিগ্ধ পরিবেশ তাকে খুব মুগ্ধ করেছে। ছবির মতো এই গ্রামটা ছেড়ে মনটা একদম যেতে চাইছে না। জাফর আর মহিনের কাছে খবরটা পৌঁছে গেল। অপুকে দেখে মহিন বলল, ‘তোমরা সত্যি সত্যি শহরে চলে যাবে?’ ‘হুম, বাবা বলেছেন, আমরা পরশু দিনই চলে যাব।’- কাতর কণ্ঠে অপু বলল। ‘তুমি চলে গেলে অনেক খারাপ লাগবে আমাদের।’- জাফর অপুর ঘাড়ে হাত রেখে কথাগুলো বলে। ‘আমারও খুব খারাপ লাগছে তোমাদেরকে ছেড়ে যেতে। তবুও যেতে হবে। স্কুল খুলে যাবে।’- বেদনাহত মনে কথাগুলো বলতে থাকে অপু। এ ক’দিনে অনেক ভালো বন্ধু হয়ে গেছে তারা।

কাল থেকে মহিনদের ক্লাস শুরু হয়ে যাবে। আগামীকাল অপুর সাথে তাদের দেখা হবে না। তাই তিন বন্ধু মিলে অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়ায়। সন্ধ্যা হলে অপুকে বিদায় জানিয়ে মহিন আর জাফর নিজেদের বাড়ি চলে আসে। বিদায়বেলায় তিন জনের চোখেই পানি চলে আসে। অপু বলে, ‘চিন্তা করো না, স্কুল ছুটি হলে আবার আসব তোমাদের গ্রামে। তোমাদের গ্রামটা অনেক সুন্দর। সবসময় মনে থাকবে তোমাদের কথা।’

সকালে সবাই রেডি হয়ে শহরের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে এমন সময় আশেপাশে চিৎকার শোনা গেল। জানা গেল, রহমতের তিন বছরের ছেলে খালে পড়ে গেছে। একথা শোনার সাথে সাথে অপু খালের দিকে দৌড় দেয়। খালে নেমে বাচ্চাটাকে উপরে তুলে আনে। বাচ্চাটার পেটে চাপ দিয়ে পানি বের করা হয়। অপুর বাবা-মা বুঝে ওঠার আগেই ঘটনাটা ঘটে যায়। পানিতে সাঁতরে বাচ্চাটাকে বাঁচানোর এই দৃশ্য দেখে তার বাবা-মা চমকে যান। ‘তুমি সাঁতার জানো!’ বাবা বিস্মিত হয়ে অপুর কাছে জানতে চান। ‘জী, জানি।’ অপু মাথা ঝাঁকায়। সাঁতার শেখার পুরো ব্যাপারটা বললে বাবা বলেন, ‘সাঁতার শিখে তুমি অনেক ভালো করেছ অপু, আসলে আমাদের প্রত্যেকেরই সাঁতার শেখা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে যারা তোমাকে সহযোগিতা করেছে তাদেরকে অনেক ধন্যবাদ।’ বাবার কথা শুনে অপু খুব খুশি হয়। জাফর, মহিনসহ সবার কথা মনে পড়ে। অপু ভাবতে থাকে এবারের গ্রীষ্মের ছুটিটা তার জীবনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

অপু শহরে এসে তার বন্ধুদের কাছে গ্রামের গল্প বলে।