অপার সম্ভাবনার সাগর

বঙ্গোপসাগর এবং আগামীর বাংলাদেশ

মুহাম্মদ ইদ্রিস আলি

২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সাথে সমুদ্রসীমার সফল নিষ্পত্তির পর ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটারের সমুদ্র অঞ্চলের মালিকানা পেয়েছে বাংলাদেশ।
২০০ নটিক্যাল মাইলের অর্থনৈতিক অঞ্চলের একচ্ছত্র অধিকার এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশের সব ধরনের প্রাণিজ, রাসায়নিক, জৈব-অজৈব কঠিন, তরল, বায়বীয় সম্পদের ওপর সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়েছে বাংলাদেশের। নিঃসন্দেহে এটি এ দেশের মানুষকে স্বপ্নবান করেছে। ভবিষ্যতের সমৃদ্ধির পথ বিনির্মাণে উদ্যমে উৎসাহী করেছে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যেই তার ১৯টি মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছেন নীল সমুদ্রের অর্থনীতিকে পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের জন্য তার আহরণ সম্ভাবনাকে সম্প্রসারিত করতে।
সীমাহীন সম্ভাবনার অফুরন্ত আধার হলো সমুদ্র। এ সমুদ্র ধারণ করে বহুমাত্রিক বৈচিত্র্যপূর্ণ খনিজ সম্পদ। তরল, কঠিন, বায়বীয়। এ সমুদ্র ধারণ করে জীব ও অজীব বৈচিত্র্য। নিঃসীম নীলিমাকে ঊর্ধ্বাকাশে ধারণ করে। পানি থেকে তলদেশ এবং তারও পরে অবারিত সম্পদ ভাণ্ডার। এ সম্পদ আমাদের সমৃদ্ধির স্বপ্নকে ভরিয়ে রেখেছে।
বাংলাদেশ সমুদ্রের পাশেই পার্শ্ববর্তী মিয়ানমার বড় গ্যাস ক্ষেত্র পেয়েছে, যা আমাদের প্রত্যয়কে আরও দৃঢ় করে। আমাদের সমতলেও দ্রুত জরিপ পরিচালনা করে তার সন্ধান নিশ্চিত করা দরকার। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের অগভীর অঞ্চলে সমুদ্র তলদেশে মূল্যবান খনিজ সম্পদের দৃশ্যমান অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। গভীর অঞ্চলেও এসবের সন্ধান পাওয়া গেছে। থোরিয়াম এবং ইউরেনিয়াম অতি মূল্যবান রাসায়নিক ধাতব তেজস্ক্রিয় পদার্থ। যে দেশ এসবে সমৃদ্ধ তারা অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ।
সিমেন্ট তৈরির অন্যতম কাঁচামাল ‘ক্লে’ এর সন্ধান মিলছে অগভীর অঞ্চলে। যে ক্লে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। তা দেশে পাওয়া গেলে সিমেন্ট শিল্প স্বনির্ভর হবে কাঁচামালে সন্দেহ নেই।
আন্তমন্ত্রণালয় সম্পর্ক যথাযথ প্রযুক্তি নির্ভর ব্যক্তিবর্গের সম্মিলনিতে নিবিড় অনুসন্ধানি সেল গঠন এখন জরুরি। অতীতের তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের তিক্ততাকে অভিজ্ঞতা হিসেবে কাজে লাগানো দরকার।
পর্যালোচনা ও গবেষণা অনুসন্ধানি সেল দৃঢ় হওয়া অত্যাবশ্যক। বাহুল্য আমলাতান্ত্রিকতার অযাচিত ও অনুৎপাদন প্রভাবমুক্ত হওয়া দরকার সমুদ্র অনুসন্ধান।
বঙ্গোপসাগরের তের স্থানে খনিজসমৃদ্ধ ভারী বালু পাওয়া গেছে। এসবে সংমিশ্রণ আছে ইলমেনাইট, গ্রানাইট, সিলেমনাইট, ম্যাগনেটাইট, জিরকনের মতো দামি খনিজের। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে গবেষণা ও অনুসন্ধানি বিজ্ঞানী সমন্বয়ে সমৃদ্ধ করে এসব অনুসন্ধান ও গবেষণাকে ত্বরান্বিত করা দরকার।
বিদেশি গবেষক ও অনুসন্ধানি দলকে ইজারা দিয়ে নিশ্চিন্ত, নির্ভরতায় থেমে থাকা অনুচিত। সমৃদ্ধির হাতছানিকে বিলম্বিত ও বিড়ম্বিত করলে আমরা পিছিয়ে যাব। আমাদের প্রত্যয় ও ধৈর্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জাতির সম্পদের অপচয় অনিবার্য হতে পারে। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০১৯ সালের আগেই সমুদ্রের নীল অর্থনীতিতে দৃশ্যমান অগ্রগতি কামনা করেন। এটি স্বপ্নকে জাগিয়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয়।
আমাদের আনুষাঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে। জরিপ কাজে যুক্ত সুবিধাকে বিস্তৃত করতে হবে। ভূতাত্ত্বিক পর্যালোচনা বিস্তৃত ও ফলপ্রসূ করতে হবে। সম্পদ যখন হাতছানি দিচ্ছে তখন সম্ভাবনাকে, সক্ষমতাকে ধারালো করতেই হবে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে চলতে আমরা অনেক মূল্যবান সময় ও সম্পদ হাতছাড়া করেছি। এ ভাবে আর না। বিদেশি কিছু জরিপ সংস্থার যৌথ অনুসন্ধানে এখন পর্যন্ত সাগরে বেশ কিছু মূল্যবান খনিজের সন্ধান মিলেছে। সমুদ্রের তলদেশের ৮০ থেকে ১২০ মিটার গভীরতায় মূল্যবান খনিজের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে।
এ সাগরের তলদেশ এবং তারও গভীরে প্লাটিনাম, কোবাল্ট, ভেনাডিয়াম, মলিবডেনাম প্রভৃতির আকরিকসহ তামা, সিসা, জিংক আছে। বিভিন্ন খনিজ আকারে সোনা, রূপা থাকাও অস্বাভাবিক নয়।
তবে গবেষণা ও জরিপ কাজ খুব ক্ষুরধার এবং তীক্ষ্ণ হতে হবে। সমুদ্রের ১৪০০ থেকে ৩৭০০ মিটার গভীরে থাকা এসব সম্পদ ও খনিজের অস্তিত্ব ও অবস্থান নির্ণয় করে তা নিশ্চিত করা সহজ কাজও নয়।
অভিযোগ আছে, বাংলাদেশের জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশ বা জিওএসবি প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছরেও নাবালকত্ব ঘুচাতে পারেনি। এ দায় আমাদের সকলের।
বিদেশি বিভিন্ন দামি প্রতিষ্ঠানের সাথে অভিজ্ঞতা বিনিময় করে আমাদের প্রযুক্তি, কারিগরি সক্ষমতা অর্জনে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে। আমলা বা অন্যান্য তান্ত্রিকতার মন্দন যেন এসব কাজকে ফিতায় বেঁধে না ফেলতে পারে তার দিকে জাতীয় তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতে হবে। ভূ-রাসায়নিকদের সাথে ভূতত্ত্ববিদ, ভূ-পদার্থবিদ প্রকৌশলীদের নিবিড় অভিজ্ঞতা ও কর্মবন্ধন তৈরি করতে হবে।
আমরা আড়ম্বর করে শুরু করি। আন্তরিকতা ও দেশপ্রেম পিছনে রাখি। আমরা দায়িত্ব পালন করি। দায়িত্ববোধকে জাগাই না। বোধহীন দায়িত্ব আমাদের কর্মে দায়িত্বশীলতাকে জাগতে দেয় না।
এ জন্যই আমাদের পালিত দায়িত্ব পুষ্টিহীন। দেশে আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয় করে ব্লু ইকোনমি সেলের যাত্রা শুরু হয়েছে। দেরি হয়েছে সন্দেহ নেই। গতীশীলতা ও বাহুল্য বর্জনে আমাদের দ্রুত লক্ষ্য অর্জনের নিবেদন আবশ্যক।
গ্যাস তেল অনুসন্ধানে পেট্রো বাংলার মতো এটি যেন গতানুগতিকতা অনুসরণ করে দীর্ঘপথের জ্যামে আটকা পড়ে না যায়-এ কামনা দেশবাসীর। দেশবাসী গভীর আগ্রহে প্রত্যাশা করে, এখানে কর্মরত প্রতিটি ব্যক্তি দেশপ্রেমের পবিত্র দায়িত্ব পালন করবেন। প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবানভাবে ব্যয় করে আমাদের সম্পদের সংগ্রহায়ন ও সংরক্ষণের জন্য কাজ করবেন। তাদের পবিত্র দায়িত্ব পালনই আমাদের সমৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে। পৃথিবীর মানুষের সাথে আমাদের প্রতিবেশিরাও বসে নেই।
সমুদ্রের পানি থেকে লবণ উৎপাদন, আধুনিক প্রযুক্তিতে সমুদ্রের ঢেউ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সমুদ্রস্রোতকে সৃষ্টি ও ব্যবহার করে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সহ বিশাল সমুদ্রাঞ্চল থেকে সোলার শক্তি উৎপাদনও দ্রুত ভাবতে হবে। পঁয়তাল্লিশ বছর আগে যে দেশটি একেবারে শূন্য থেকে শুরু করে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক কূটকৌশলের জাল এক এক করে ছিন্নকরে সমৃদ্ধির মহাসড়কে ধাবমান-সমুদ্র তার উপরি পাওনা। সমুদ্রের অবারিত সম্পদরাজি আমাদের সমৃদ্ধির স্বপ্ন দুয়ার খুলে ধরেছে। এ সম্পদ আহরণ ও সঞ্চায়ন করে আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে দেশকে নিয়ে যাব এ স্বপ্ন সবার চোখেমুখে।
আমাদের স্বাধীনতার অধরা স্বপ্নগুলো আমাদের প্রতিনিয়ত হাতছানি দিচ্ছে। কুয়াশা কেটে যাচ্ছে। আলোর উজ্জ্বল আভাসে চারিদিকে আলোকিত হচ্ছে। সমুদ্রসম্পদ কেবলই আমাদের সম্পদ। আমরা আমাদের আগামী প্রজন্মকে সমুদ্রের নীল অর্থনীতির স্বপ্ন দিয়ে সমৃদ্ধ করবো-এ আমাদের প্রত্যয়।
এ প্রত্যয়কে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমরা সতর্কতার সাথে দ্রুত এগিয়ে যাবো। জাতীয় ঐক্য, জাতীয়তাবাদ দিয়ে আমরা আমাদের জাতীয়তাবোধকে শানিত করবো। প্রত্যয় এই-প্রজ্ঞা এই। আসুন এগিয়ে যাই। জাতিকে এগিয়ে নিতে মননকে শানিত করি।
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক

আপনার মন্তব্য লিখুন