অপরূপা সীতাকুণ্ড

লিটন কুমার চৌধুরী

পাহাড় এবং সমুদ্র বরাবরই আকর্ষণ করে ভ্রমণ পিয়াসিদের। প্রকৃতির নিবিড় ছোঁয়া আর বুক উজাড় করা সৌন্দর্য মুহুর্তেই ভুলিয়ে দেয় জীবনের যাবতীয় হতাশা। পাহাড়ি প্রকৃতির একান্ত সান্নিধ্য আর উচ্ছ্বল ঝর্ণার শীতল স্পর্শ পেতে হলে সীতাকুণ্ডও হলো প্রকৃত স’ান।
চন্দ্রনাথ পাহাড়
গিরিসৈকতের লীলাভূমি সীতাকুণ্ডের মনোরম প্রাকৃতিক শোভাকে করে তুলেছে অপরূপ। ছোট-বড় পাহাড়ের শ্যামল বনানীর কোলে পাখিদের কিঁচির-মিচির, বিচিত্র সাপের আনাগোনা, বনহরিণের চঞ্চল ছুটোছুটি, বানরের লাফালাফি, ভলুকের বাদুরঝুলা আর ভর সন্ধ্যায় শেয়ালের হুয়াক্কাহুয়া-এর শ্যামল পাহাড়ের প্রাকৃতিক শোভাকে করে তুলেছে নৈসর্গিক কাব্যময়। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের শীর্ষে রেেছ সনাতন সমপ্রদারের পুণ্যস’ান চন্দ্রনাথ শিব মন্দির। পাহাড়ের পাদদেশ থেকে ১২’শ ফুট উপরে মোট ষোলশত সিঁড়ি বেয়ে শিব মন্দিরে উঠতে হয়। এই চন্দ্রনাথ পাহাড়কে ঘিরে রয়েছে আরো অর্ধশতাধিক মঠ ও মন্দির। মন্দিরে যাওয়ার পূর্বে আঁকা-বাঁকা পথ এপলকে চোখ পড়বে পাহাড়ে জন্মানো প্রাকৃতিক হৈমন্তি, লেনটোনা ও সোনালুর বাহারী ফুল অথবা দুরে সাদা কাঁশ ফুলের সমারোহ।
ইকো-পার্ক ও বোটানিক্যাল গার্ডেন
সীতাকুন্ড পৌরসদর থেকে দুই কিলোমিটার দক্ষিণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে গেলেই ফকিরহাট এলাকায় বোটানিকেল গার্ডেন ও ইকোপার্ক। ১৯৯৬ একর ভুমির পার্কটি দুই অংশে বিভক্ত। এক হাজার একর জায়গায় বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ৯৯৬ একর জায়গা জুড়ে ইকোপার্ক এলাকা। ৩টি পিকনিক স্পট, ৮টি বিশ্রাম ছাউনি সম্বলিত ইকোপার্কে রয়েছে- পাহাড়ের মাঝে সৃজিত ১৪৫ প্রজাতির গাছ-গাছালি, দূলর্ভ কালো গোলাপসহ ৩৫ প্রকার গোলাপ এবং বিভিন্ন প্রজাতির দৃষ্টিনন্দন ১০০টি অর্কিট আছে। এই পাহাড়ে রয়েছে হারিয়ে যাওয়া মেছোবাঘ, ভালুক, মায়াহরিণ, বানর, হনুমান, শুকর, বনরুই, সজারু, বনমোরগ। দাড়াঁশ, গোখরা, লাউডগা, কালন্তি নামক সাপ।
বোটানিক্যাল গার্ডেনে রয়েছে দুইটি সুপ্তধারা ও সহস্রধারা নামে দুটি জলপ্রপাত। শত ফুট ওপর থেকে অভিরাম গড়িয়ে পড়া ঝর্ণাতে একটু ভেজা বা উঞ্চতা আহরনের আনন্দ আলাদা। এখানে এসে পানির শিগ্ধ পরশ পাওয়ার লোভ সামলাতে পারেননি আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামও। তাইতো তিনি এই ঝর্ণার পরশ নিতে ১৯২৬ সালে ও ১৯২৯ সালে ছুটে এসেছিলেন। রচনা করেছেন তাঁর বিখ্যাত গান “আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ। ঐ পাহাড়ের ঝর্ণা আমি উধাও হয়ে রইগো”। এখানে যেতে হলে চট্টগ্রাম শহর থেকে বাস, মেক্সী, টেক্সীতে ৩৭ কি.মি. উত্তরে এলে কিংবা সীতাকুণ্ড থেকে ২কি.মি.দক্ষিণে ইকোপার্ক। বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকো-পার্কে প্রবেশ মূল্যে জনপ্রতি ১০টাকা।
বারৈয়াঢালা সহস্রধারা জলপ্রপাত
চারদিকে সবুজ পাহাড়। মাঝখানে পাহাড় থেকে অবিরাম পড়ছে জলপ্রপাত। পাহাড়ের নীচে দাঁড়িয়ে উপভোগ করা যায় বারৈয়াঢালা সহস্রধারা জলপ্রপাতের অপরূপ এই দৃশ্য। সীতাকুণ্ড সদর থেকে পাঁচ কিলোমিটার উত্তরে বারৈয়াঢালা পাহাড়ের পাদদেশে পাহাড়ঝরা সহস্রধারা। তিন’শ ফুট উঁচু একটি পর্বত শীর্ষ থেকে জলধারা শিলাময় স’ানে পতিত হয়। এত উচুঁ পাহাড় থেকে এভাবে যুগ যুগ ধরে জলপ্রপাতের ধারাটি নিচে যাওয়ার ফলে এখানে বিশাল কুণ্ড সৃষ্টি হয়েছে। উচুঁ-নিচু দুর্গম টিলার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতে হয় সহস্রধারায়। জন্মলগ্ন থেকেই পাহাড়ি ঝরনাটির চারদিকে আছে বিরাট বিরাট পাথরের স’প। ঝরনাধারার স্বচ্ছ পানি দিয়ে নানা জাতের সবজি ফলিয়েছে এলাকার চাষিরা। ঝরনাটি থেকে ৫০ গজ দুরে পুরাকীর্তি সজ্জিত লবণাক্ষ মন্দিরে রয়েছে একটি শিবলিঙ্গ। এখানে আসার জন্য কোনো ফি লাগে না। কৈফিয়ত দিতে হয় না কাউকে। নিরাপত্তার জন্য দলবেঁধে এখানে আসা ভালো। প্রকৃতির ছায়া ছাড়া কোনো বিশ্রামাগার নেই।
বোয়ালিয়াকুল সমুদ্র সৈকত
পর্যটকদের কাছে অন্যতম আর্কষণীয় স’ান বোয়ালিয়াকুল সমুদ্র সৈকত।
চট্টগ্রাম থেকে ২৮কিঃমিঃ উত্তরে বাঁশবাড়িয়া নামক বাজারের পশ্চিম দিকে গ্রামের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত আঁকা-বাঁকা পিচঢালা এক কিঃ মিঃ পথ অতিক্রম করলেই ধরা দেবে এই বোয়ালিয়াকুল সমুদ্র সৈকত। এখানে এসে নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়ানো যাবে, আহরন করা যাবে প্রকৃতির শোভা। উত্তরে কেওড়া ও ঝাইগাছের বনাঞ্চল, দক্ষিণে ঝাউ বাগান ও নতুন জেগে উঠা বিশাল বালির মাঠ। দুই কিলোমিটার এলাকা জুড়ে রয়েছে ঝাউগাছ। আর্কিটেকচারার পদ্ধতিতে লাগানো এ ঝাউবাগান দর্শনার্থীদের দারুণ বিমোহিত করে। সমুদ্রের তীর ঘেঁষে এ মাঠে দাঁড়িয়ে পশ্চিমে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে সমুদ্রের পানির হৃদয় ছোঁয়া ঝিকিমিকি, সন্দ্বীপ থেকে আসা লঞ্চ-ষ্টিমার কিংবা জেলেদের ছোট ছোট ডিঙ্গি নৌকা।
ভাটিয়ারী-হাটহাজারী বাইপাস সড়ক ও কৃত্রিম হ্রদ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাথে সংযুক্ত ভাটিয়ারী-হাটহাজারী সড়ক। বিস্তৃত পাহাড় অতিক্রমকারী সর্পিল এই সড়কের দুই পাশেই রয়েছে দৃষ্টিনন্দন কৃত্রিম হৃ্রদ প্রাকৃতিক পরিবেশকে করে তুলেছে চমৎকার ও মনোমুগ্ধকর।

আপনার মন্তব্য লিখুন