অপরাধ অব্যবস্থাপনার মামলা অবহেলার!

মোহাম্মদ রফিক

সাতকানিয়া ট্র্যাজেডি নিয়ে পুলিশ রহস্যজনক ভূমিকা পালন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কেএসআরএম কর্তৃপড়্গের ব্যবস’াপনা ত্রম্নটির কারণে ১০ নারীর মর্মানিত্মক মৃত্যু ঘটলেও পুলিশ বলছে অবহেলার কারণে এটি দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু। ঘটনার পর থানায় মামলা রেকর্ড করার ড়্গেত্রেও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দায়ীদের রড়্গা করতে জামিনযোগ্য সাধারণ ধারায় পুলিশ মামলা রেকর্ড করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
আইনজ্ঞরা বলছেন, অব্যবস’াপনা ত্রম্নটির কারণে দশটি প্রাণ ঝড়ে গেলেও পুলিশ মামলা নিয়েছে ফৌজদারি দ-বিধির ৩০৪ (ক) ও ৩৪ ধারায়। এ দুটি ধারা জামিনযোগ্য। পুলিশের সদিচ্ছা থাকলে আসামিদের বিরম্নদ্ধে এরচেয়ে আরও কঠিন এবং অজামিনযোগ্য ধারায় মামলা নিতে পারত। মূলত আসামিদের রেহাই দিতে সাধারণ ধারায় মামলা রেকর্ড করেছে পুলিশ।
এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক কমিটি (সনাক) ও টিআইবির চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি সিনিয়র আইনজীবী আকতার কবীর চৌধুরী সুপ্রভাতকে বলেন, ‘হিটস্ট্রোকের অজুহাত দাঁড় করিয়ে ময়নাতদনত্ম না করাটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এটা ন্যায়বিচারে এক ধরনের বাধা। ন্যায়বিচারের স্বার্থে মামলার তদনত্ম কর্মকর্তার উচিত কবর থেকে তুলে মরদেহগুলোর ময়নাতদনত্ম করা। এড়্গেত্রে মানবাধিকার সংগঠনগুলো ভূমিকা রাখতে পারে।’
জেলা আদালতের সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট আবুল হাশেম জানান, দ-বিধির ৩০৪ (ক) ধারা হলো-‘অবহেলার ফলে মৃত্যুর শাসিত্ম’। ৩৪ ধারা হলো-‘কমন ইনটেনশন বা একই উদ্দেশ্য পূরণকল্পে কতিপয় ব্যক্তি কর্তৃক কার্যাবলী’। দ-বিধির ৩০৪ (ক) ধারায় অপরাধে অভিযুক্ত আসামির শাসিত্ম সর্বোচ্চ তিন বছর অথবা জরিমানা অথবা উভয় দ-ে দ-িত করতে পারেন বিচারক।
এদিকে ময়নাতদনত্ম ছাড়া দশটি মরদেহ দাফনের পর থানায় মামলা রেকর্ড করা নিয়ে আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যত্তয় ঘটেছে বলে মনত্মব্য করেছেন আইনজীবীরা। জেলা আদালতের সাবেক পিপি আবুল হাশেম বলেন, ‘মামলার সঠিক তদনেত্মর প্রয়োজনে এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থে মরদেহ দাফনের আগে ময়নাতদনত্ম করা বাঞ্চনীয় ছিল। সেটি না হওয়ায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করণে বিঘ্ন ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয় করতে হলে ময়নাতদনত্ম প্রয়োজন।’
জানতে চাইলে জেলা পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় সুপ্রভাতকে বলেন, ‘এটি অবহেলাজনিত দুর্ঘটনায় মৃত্যু। অপমৃত্যু ও খুনের মামলায় লাশের ময়নাতদনত্ম করা হয়। দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে ময়নাতদনত্ম হয় না। কেএসআরএম কর্তৃপড়্গের অবহেলার কারণে হুড়োহুড়িতে পদদলিত হয়ে দশ নারীর মৃত্যু হয়েছে বলে জামিনযোগ্য ধারায় মামলা নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় করা মামলায় কবির স্টিল রি-রোলিং মিলস (কেএসআরএম) ব্যবস’াপনা পরিচালক মো. শাহজাহান এবং অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মামলার তদনত্ম চলছে।’
মামলার এজাহারে একমাত্র আসামি হিসেবে কেএসআরএম’র ব্যবস’াপনা পরিচালক মো. শাহজানের নাম উলেস্নখ করেছেন বাদি। মামলা দায়েরের একদিন পর ঘটনাস’লে স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালনকারী কেএসআরএম’র চার কর্মচারীকে গ্রেফতার করলেও প্রতিষ্ঠানের ব্যবস’াপনা পরিচালক মো. শাহজাহান এখনও অধরা কেন এমন প্রশ্ন করা হলে পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা বলেন, ‘আমরা গ্রেফতারের জন্য তাকে খুঁজছি।’
ময়নাতদনত্ম ছাড়া দাফনের পর মামলা রেকর্ড করেছেন, এখন আইনের কী প্রক্রিয়ায় মামলাটির তদনত্ম চলবে জানতে চাইলে সাতকানিয়া থানার ওসি রফিকুল হোসেন বলেন, ‘জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মামলাটি তদারক করছেন। তাদের নির্দেশনা মোতাবেক তদনত্ম হবে। এছাড়া ঘটনার পর পর ঘটনাস’লে আসেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইলিয়াস হোসেন। এসময় মরদেহের কাটাছেঁড়া না করতে কিংবা ময়নাতদনত্ম না করতে ভিকটিমের পরিবার ডিসি মহোদয়কে অনুরোধ করেন। তিনি (ডিসি) অনুমতি দেওয়ার পর মরদেহ দাফন করা হয়।’
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ইলিয়াস হোসেন গতকাল রাত সোয়া আটটায় সুপ্রভাতকে বলেন, ‘সাধারণত মৃত্যুর রহস্য জানতে মরদেহের ময়নাতদনত্ম করা হয়। সেদিন কী ঘটেছে তা সবাই দেখেছে। এখানে কেউ কাউকে খুন করেনি। অবহেলার কারণে এ ট্র্যাজেডি সংঘটিত হয়েছে। এখন দেখতে হবে কেএসআরএম কর্তৃপড়্গের কতটুকু অবহেলা কিংবা গাফিলতি হয়েছে। এজন্য জেলা প্রশাসনের পড়্গ থেকে একটি তদনত্ম কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া আদালত যদি প্রয়োজন মনে করে তাহলে অবশ্যই ময়নাতদনত্ম করা হবে।’
প্রসঙ্গত, গত ১৪ মে সকালে সাতকানিয়া থানাধীন নলুয়া এলাকায় কাদেরিয়া মঈনুল উলুম দাখিল মাদরাসা প্রাঙ্গণে কেএসআরএম গ্রম্নপের ইফতার সামগ্রী আনতে যান ২০ হাজারের বেশি মানুষ। এসময় সেখানে অতিরিক্ত ভিড়ের চাপে হুড়োহুড়িতে পদদলিত হয়ে প্রাণ হারান দশ হতভাগ্য নারী। আহত হন আরো অনত্মত ৩০ জন। ঘটনা তদনেত্ম অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মশহুদুল কবিরকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেন জেলা প্রশাসক ইলিয়াস হোসেন।
ওই ঘটনায় নিহত হাসিনা আক্তারের স্বামী মো. ইসলাম বাদি হয়ে গত ১৫ মে সকালে সাতকানিয়া থানায় একটি মামলা করেন। এতে ইফতার সামগ্রী বিতরণকালে কেএসআরএম কর্তপড়্গের অব্যবস’াপনা ও গাফিলতির কারণে এ ঘটনার অবতারণা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। মামলায় কেএসআরএম ব্যবস’াপনা পরিচালক মো. শাহজাহান ও ইফতার সামগ্রী বিতরণ কাজে নিয়োজিত অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। এদের বিরম্নদ্ধে বাদি দ-বিধির ৩০৪ (ক) ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ এনেছেন। সাতকানিয়া থানার ওসি (তদনত্ম) মুজিবুর রহমানকে মামলা তদনেত্মর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
পদদলনে নিহতের ঘটনায় করা মামলায় চারজনকে গত ১৫ মে গ্রেফতার করেছে সাতকানিয়া থানা পুলিশ। তারা হলেন মক্কারবাড়ি মাদার্শা এলাকার ছিদ্দিক আহম্মদের ছেলে মুরিদুল আলম ওরফে মুরাদ (২৭), পূর্ব গাটিয়াডাঙ্গার জাকির হোসেনের ছেলে মো. ইদ্রিছ (২৬), আমিলাইশ এলাকার মো. সোলায়মানের ছেলে হাবিব আহমদ শাহেদ (৩২) এবং হাঙ্গরমুখ এলাকার মো. ইদ্রিছের ছেলে আজগর আলী (২৮)।