নারী ও শিশুরা নিষ্ঠুরতার শিকার

অপরাধীদের দ্রুত বিচার করুন

সম্পাদকীয়

নতুন বছরের শুরুতেই সামাজিক অপরাধের যে সব ভয়াবহ খবর সংবাদ মাধ্যমে আসছে তাতে আমাদের সমাজের অবক্ষয়ের চিত্রটিই ফুেট উঠছে । আর বলাবাহুল্য, সামাজিক অপরাধপ্রবণতার এখনই লাগাম টেনে না ধরলে, অপরাধী-সন্ত্রাসী-দুর্বৃত্তদের কঠোর শাস্তি না দিলে সমাজকে সমূহ পতনের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না। নোয়াখালীর সুবর্ণচরের এক গৃহবধূর গণধর্ষণের ঘটনায় দেশজুড়ে যে প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদ হয়েছে তা নতুন সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে যদিও পুলিশ এই নারকীয় অপরাধের হোতাদের গ্রেফতার করেছে দ্রুত। নারী ও শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ রূপ দেশবাসীকে স্তম্ভিত করে দিচ্ছে। ঢাকার ডেমরা ও গেন্ডারিয়ায় একেবারে শিশু ৩ জনকে ধর্ষণ প্রচেষ্টা ও হত্যার ঘটনা মানুষের পাশব বৃত্তিকেই মনে করিয়ে দেয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কি গ্রামে, কি শহরে শিশু-কিশোরী-নারীদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হচ্ছে। ফেনী শহরে দীর্ঘদিন ধরে ৪ তরুণীর ওপর যৌননিগ্রহ চলেছে। পুলিশ দুই দুর্বৃত্তকে এ ঘটনায় গ্রেফতার করেছে। নারীরা এখন শহরে-গ্রামে নানা কাজে নিয়োজিত। তাদের জীবনের নিরাপত্তা, সম্ভ্রম নিশ্চিত করতে না পারলে তারা কাজ করবে কি ভাবে? যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্তের কারণে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদার অষ্টম শ্রেণীর এক ছাত্রী স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে মর্মে পত্রিকান্তরে প্রকাশ। সাতক্ষীরায় আশাসুনি উপজেলায় তৃতীয় শ্রেণীর এক ছাত্রীকে ধর্ষণের পর পানিতে ফেলে হত্যা করা হয়। নোয়াখালী সদর উপজেলায় গত বুধবার এক তরুণীকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। শিশু-কিশোর-নারীদের ওপর এমন পাশবিক, বীভৎসতার ঘটনায় শঙ্কিত, ক্ষুব্ধ অভিভাবককুল। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) গত বছরের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গড়ে প্রতিদিন ১৪ শিশু নানা নিষ্ঠুরতার শিকার হচ্ছে। এই পরিসংখ্যানের বাইরেও শিশু-নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে চলেছে যা সংবাদপত্রে আসে না। অনেকে লোকলজ্জা হয়রানি বা আর্থিক অসংগতির কারণে মামলা করতে চান না। মানবাধিকার কর্মী ও অপরাধবিজ্ঞানীরা বলছেন, মাদকের ভয়াবহতা, সামাজিক অবক্ষয়, দ্রুত সুবিচারের ব্যবস্থা করতে না পারা, অপরাধী ও দুর্বৃত্তদের শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারা সর্বোপরি এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে সমাজের ভেতর থেকে প্রতিরোধ গড়ে না ওঠায় শিশু ও নারীদের এরূপ ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। তদুপরি সমাজে ও রাষ্ট্রে সুশাসন অনুপস্থিত থাকলে প্রতিকার চাওয়া কঠিন হয়, এতে নারী ও শিশুরা অসহায় হয়ে পড়ে। আইন থাকলেও আইনের কঠোর ও যথাযথ প্রয়োগের উদারণ খুবই কম। তদুপরি রাজনৈতিক-সামাজিক অস্থিরতা, পরিবারের অসতর্কতার কারণেও নারী-শিশুদের নিরাপত্তা বিপন্ন হয়ে পড়ে। সাইবার প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ ও এর অপব্যবহারের কারণেও অনেকের মধ্যে বিকৃত মানসিকতা দেখা দিচ্ছে।
নারী ও শিশু সুরক্ষায় রাষ্ট্রের প্রশাসন তৎপর না হলে, অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে এ ধরণের নির্যাতন বন্ধ করা যাবে না। মাদকাসক্তি, সন্ত্রাস ও অপরাধ প্রবণতার বিরুদ্ধে কেবল প্রশাসন নয়, সমাজ ও পাড়া প্রতিবেশীদের সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, সকল স্তরের জনপ্রতিনিধি, নানা পেশার মানুষ সহ সকলকে নারী-শিশু নির্যাতনের মতো ভয়াবহ অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আজ আমাদের সমাজে যে অসুস্থ ধারা ছড়িয়ে পড়েছে তা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সামাজিক পেশাজীবী সংগঠনগুলিকে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।