অন্ধকার থেকে উৎসারিত আলো

ফারহানা আনন্দময়ী
cave cartoon

জানো তো, পৃথিবীতে সবচেয়ে ভালো নেশা হলো বই পড়া। আর তারপরেই আছে ‘আবিষ্কারের নেশা’। নতুন কিছুর খোঁজে কাজের সময় থেকে একটু সময় বের করে একা কিংবা বন্ধুদেরকে নিয়ে একটু অ্যাডভেঞ্চার করা। ওরাও কিন’ সেই আবিষ্কারের নেশাতেই বেরিয়েছিল। ওরা মানে থাইল্যান্ডের বারোজন শিশু-কিশোর। ওরা খুদে ফুটবলার, ওদের দলের নাম ‘ওয়াইল্ড বোর’।
থাইল্যান্ডের চিয়াং রাই প্রদেশে গত ২৩ জুন তোমাদের মতই একদল শিশু-কিশোর ফুটবল খেলার প্র্যাক্টিসে বেরিয়েছিল। সঙ্গে ওদের কোচ-ও ছিল। বিকালে ফুটবল প্র্যাক্টিস শেষে ওদের মাঠের পাশেই একটা পাহাড়ি গুহা, ‘থাম লুয়াং’…ওই গুহায় ওরা সকলে ঢুকেছিল, ওদিনই যে প্রথম তা নয় কিন’। ওরা আগেও কখনো ঘুরতে গেছে ওই গুহায়। কিন’ সেদিন ভাগ্যটা ওদের সহায় ছিল না। দশ কিলোমিটার দীর্ঘ গুহাটায় ওরা যখন চার কিলোমিটার পর্যন্ত হেঁটে পৌঁছেছে, ঠিক তখনই বাইরে তুমুল বৃষ্টি শুরু হলো, আকস্মিক বৃষ্টি আর বন্যার পানিতে গুহার মুখ ভরে গিয়ে বেরোনোর পথ বন্ধ হয়ে গেলো। গুহার ভেতরে ঠিক যেন এক নদী বইছে তখন। সন্ধ্যা হয়ে গেছে, ওরা কেউ ঘরে ফিরছিল না। ওদের মা-বাবা বন্ধুরা খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে দেখলো মাঠের পাশে গুহার মুখে ওদের বাইসাইকেল, ব্যাগ, ফুটবল বুট সব পড়ে আছে। সবাই বুঝে নিলো, ওরা গুহার ভেতরে ঢুকে আটকা পড়েছে।
সেই থেকে খোঁজাখুঁজি শুরু হলো, কিন’ গুহার ভেতরে তো কেউই ঢুকতে পারছে না। নয়দিন পরে দু’জন ব্রিটিশ ডুবুরি গুহার ভেতরে ঢুকে অনেকদূরে গিয়ে ওদেরকে পেল। ভাবো তো, নয়দিন তোমাদের মত এই শিশুরা খাবার-না-খেয়ে, চারিদিকে অন্ধকার, বাদুড়-ইঁদুর আর কাদা-পানির উপরে ছোট্ট একটা পাথরের ওপরে ব’সে ওরা কীভাবে কাটিয়েছিল! কিন’ শুধু ওদেরকে পেলেই তো হবে না, গুহা থেকে বের তো করতে হবে। এইবার শুরু হলো সেই বিপজ্জনক দুঃসাহসী উদ্ধার অভিযান। এই চূড়ান্ত অভিযানের মাঝের দিনগুলোতে খাবার আর সিলিণ্ডারে ভ’রে অক্সিজেন সরবরাহ চলতে থাকল।
দক্ষ ৪০ জন থাই আর ৫০ জন আন্তর্জাতিকমানের বিদেশি ডুবুরির সমন্বয়ে ৮ জুলাই শুরু হলো সেই চূড়ান্ত উদ্ধার কাজ। ভীষণ কঠিন সেই অভিযান! তিনদিন ধ’রে এতোগুলো মানুষের ঐকান্তিক চেষ্টায় ১০ জুলাই বিকেলে গুহার সেই সুড়ঙ্গপথ পেরিয়ে ওদের সবাইকে গুহা থেকে জীবন্ত বের করা হলো। সারাপৃথিবীর মানুষ এই দিনটির অপেক্ষায়ই যেন ছিল। দেশ-জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষই ওদের মঙ্গল কামনায় একজোট হয়েছিল।
কে বলে, পৃথিবীতে শুধু যুদ্ধ হয়, মানুষ মানুষকে হিংসা করে, পৃথিবী দিনেদিনে অমঙ্গলময় অন্ধকার এক গ্রহে পরিণত হচ্ছে? না, পৃথিবীতে এখনও কিছু আলো আছে, এখনও কিছু ভালো মানুষ আছে। এই কিছু আলো আর অল্প কিছু ভালো মানুষের জন্যই পৃথিবী আজও এতো সুন্দর। ওদেরকে উদ্ধারকাজের মাঝে একজন থাই ডুবুরি নিজের জীবনকেও উৎসর্গ করেছেন। যুদ্ধ-বোমা, গুম-মৃত্যু, হিংসা-বিদ্বেষের এতো অন্ধকারের মধ্যেও মানুষের জন্য মানুষের এই মানবিকতাটুকৃই আলো। অন্ধকার থেকে উৎসারিত আলো।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় কী জানো? এই যে সতের দিন ধ’রে এই বারোজন শিশু অন্ধকার গুহার মধ্যে চরম অনিশ্চিত এতোগুলো দিন কাটালো, ওরা কিন’ একবারের জন্যও আশা ছাড়েনি জীবনের। ওদেরকে গুহার মধ্যে খুঁজে পাওয়ার পরে গত প্রায় এক সপ্তাহ ধ’রে যখনই ওদের খাবার, অক্সিজেন নিয়ে ডাক্তার বা ডুবুরিরা ভেতরে গেছে, ওরা বারবারই বার্তা পাঠিয়েছে, আমরা ভালো আছি, আমরা শক্ত আছি, আমরা বেরোবার অপেক্ষায় আছি। আমাদের কোচ আমাদের খুব খেয়াল রাখছেন। মা-বাবা, তোমরা আমাদেরকে নিয়ে চিন্তা কোরো না।” এদেরকেই বলে স্বপ্নবান মানুষ, এদেরকেই বলে অদম্য সাহসী মানুষ, একেই বলে সংগ্রামী মনোবল। বিনা লড়াইয়ে জীবনকে একবিন্দু ছাড় দিতে শেখেনি ওরা।
ওদেরকে এই লড়াইটা শিখিয়েছে ওদের পরিবার, ওদের সমাজ, ওদের রাষ্ট্র। মানসিকভাবে শক্ত থেকে বিপদে লড়াই করার মন্ত্রটা ওরা ছোটবেলা থেকেই শিখে এসেছে। ওদের রাষ্ট্র ওদের পাশে থেকে সাহস জুগিয়েছে। তাইতো, এমন একটি দুর্যোগে থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী এই খুদে ফুটবলারদেরকে বলতেই পারেন, “ওরা খেলোয়ার, ওরা শক্তিমান।” শুধু থাইল্যান্ড একা নয়, পৃথিবীর সবচেয়ে সাহসী সব বিদেশি ডুবুরিদেরকে ওরা ওদের উদ্ধারকাজে সাথে ডেকে নিয়েছে, প্রাণপণ চেষ্টা করেছে আটকে পড়া একটি শিশুও যেন জীবন থেকে হারিয়ে না যায়। ওদের স্বপ্নদেখার চোখকে আলোর মুখ দেখিয়েছে।
গত সতেরদিন ধ’রে আমরা দেখলাম, এখনও এই পৃথিবীতে মানুষ মানুষের জন্য, মানুষ জীবনের জন্য। তোমাদেরকেও বলি, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হয়ে জীবনে সফলতার স্বপ্ন দেখার আগে একজন ভালো আর সাহসী মানুষ হওয়ার স্বপ্নটা চোখে গেঁথে নাও। নিজেদের স্বপ্ন নিজেরা দেখার সাহস করো। নিজেদের চোখে নিজেদের স্বপ্ন আঁকো, আমরা তো পাশে আছি, রংতুলির কৌটোটা এগিয়ে দেয়ার জন্য।