অনুপ্রবেশ থামছে না রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনেও ধীর গতি

সম্পাদকীয়

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ‘জাতি নিধন অভিযান’ থেকে বাঁচতে আজ থেকে ছয় মাস আগে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ শুরু হয়েছিল। বর্তমানে প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া চললেও তার গতি অত্যন্ত মন’র এবং সে সাথে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় নেওয়াও থামছে না। গত শনিবারও সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ২২টি রোহিঙ্গা পরিবারের ৮২ জন সদস্য বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। এ নিয়ে গত ১০দিনে এদেশে নতুন করে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়াল ১ হাজার ২৩ জনে।
জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত বছরের ২৫ আগস্টের কথিত সন্ত্রাসী ঘটনার পর ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৭৩ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। পরের সপ্তাহেই সেই সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লাখ ৯০ হাজার, ১৫ সেপ্টেম্বর ৪ লাখ ৯ হাজার এবং ৩০ সেপ্টেম্বর তা ৫ লাখ ৭ হাজার ছাড়িয়ে যায়। মিয়ানমারের সংবাদ সাময়িকী ইরাবতীর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯০ শতাংশ এ দফায় দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
মানবিক কারণে বাংলাদেশ এত বিশাল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিলেও আন্তর্জাতিক চাপে মিয়ানমার সরকার বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সে দেশে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয় এবং সে লক্ষে গত নভেম্বরে বাংলাদেশ সরকারের সাথে চুক্তি সই করে। সে চুক্তির আলোকে বাংলাদেশে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া চললেও মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা বিতারণ থামছে না। ইতিমধ্যে পুড়িয়ে দেওয়া রোহিঙ্গা বসতিগুলো বুলডোজার দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে ফেলার ছবি প্রকাশ হওয়ায় বিশ্বব্যাপী মিয়ানমারের প্রতি নিন্দার ঝড় উঠেছে। এমন এক পরিসি’তিতে রোহিঙ্গারা কবে নাগাদ তাদের মাতৃভূমিতে ফিরবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এদিকে মিয়ানমার সেনাপ্রধানসহ নৃশংসতায় জড়িত জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার প্রস’তি নিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) আজ সোমবার ব্রাসেলসে ইইউ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে এ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে। এর পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের সে দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া ও চলছে ধীরগতি। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার বড় দুটি কাজ তালিকা চূড়ান্ত করা এবং অন্তর্বর্তীকালীন শিবির তৈরির কাজ চলছে অত্যন্ত ধীরগতিতে। সেই কাজ দুটি কবে নাগাদ শেষ হবে তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বুঝে উঠতে পারছেন না। এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট প্রলম্বিত হওয়ায় এ সমস্যা সমাধানে বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগ জোরালো করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর রাশিয়া সফরের সম্ভাবনার কথা জানা গেছে।
রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ছয় মাস পূর্ণ হয়েছে গতকাল। এত বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাদের দীর্ঘদিন বাংলাদেশে রাখা সম্ভব নয়। ইতিমধ্যে ত্রাণের পরিমাণও কমে এসেছে। এছাড়া গত ছয় মাসে এত বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গাদের ধারণ করতে গিয়ে বাংলাদেশও নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত হচ্ছে।
ইতিমধ্যে রোহিঙ্গা শিবিরে নানা প্রকার অপরাধমূলক কাজও সংঘটিত হয়েছে। মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক কিছু সংগঠনও সেখানে তৎপর হয়ে উঠেছে। ভেঙে পড়েছে স’ানীয়দের সামাজিক অবস’ানও। ফলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া যত ধীরে হবে এইসব সমস্যাও ততই প্রকট থেকে প্রকটতর হয়ে উঠবে। কাজেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে এই প্রক্রিয়া দ্রুততর করতে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া এবং সমস্ত কাজের মধ্যে সুসমন্বয় সাধন করা।