বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদন

অনিরাপদ পানি, আর্সেনিক দূষণ

সম্পাদকীয়

বিশ্ব ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পানি ও স্যানিটেশন সুযোগে উন্নতি সত্ত্বেও দেশের পানীয় জলের নিরাপদ উৎসগুলিতে ব্যাকটেরিয়া ও আর্সেনিকের ভয়ংকর মাত্রায় উপস্থিতি রয়েছে। পরিশোধিত পানির ৪১ শতাংশের মধ্যে ক্ষতিকর জীবাণু ই- কোলাই রয়েছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ১৩ শতাংশ পানির উৎস আর্সেনিক দূষণের জাতীয় মাত্রার উপরে রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম ও সিলেটে আর্সেনিক দূষণের পরিমাণ বেশি।
ঢাকায় ‘প্রমিজিং প্রগ্রেস ও ডায়াগনস্টিক অব ওয়াটার সাপ্লাই স্যানিটেশন, হাইজিন অ্যান্ড পভার্টি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্ব ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ জর্জ জোসেফ বলেন, শহরের ৫২ শতাংশ ও গ্রামের মাত্র ২৭ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের পাইপ লাইনে পানির ব্যবস্থা আছে, গৃহস্থালিতে স্যানিটেশন ব্যবস্থার অগ্রগতি হয়েছে তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে সেই সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বাংলাদেশে মাত্র ৫২ শতাংশ ম্যানুফাকচারিং কারখানায় টয়লেট রয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য আলাদা টয়লেট রয়েছে মাত্র অর্ধেকের মতো স্কুলে, ১০০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে টয়লেট আছে মাত্র ১টি।
বিশ্ব ব্যাংকের প্রতিবেদনের আলোকে ব্যবস্থা নিতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। আমাদের পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে ঠিকই, তবে বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্যতা, স্যানিটেশন সকলের জন্য পর্যাপ্ত করতে পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। বিশেষ করে কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে দ্রুতই প্রচেষ্টা নিতে হবে। শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিছু সুযোগ আছে কিন্তু গ্রামের প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা শোচনীয়। ছাত্রছাত্রীর তুলনায় শৌচাগার, টয়লেট একেবারেই কম। তদুপরি এগুলি অসম্ভব অপরিচ্ছন্ন থাকে, যা নানা রোগের উৎস। সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়না, কর্তৃপক্ষের নজরও এদিকে কম। অথচ শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য উন্নত স্যানিটেশন অপরিহার্য শর্ত। স্যানিটেশন অসুবিধার কারণে অনেক ছাত্রী নিয়মিত স্কুল কলেজে আসতে চায় না। শিল্পপ্রতিষ্ঠান কিংবা ছোট ছোট দোকান, অফিসেও স্যানিটেশন ব্যবস্থা অপ্রতুল, কোথাও একেবারে নেই। অথচ স্বাস্থ্যসম্মত জীবনের জন্য স্যানিটেশন অতি প্রয়োজনীয় একটি বিষয়। বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্যতা নিয়ে সংকট দীর্ঘদিনের, পার্বত্য জেলা ছাড়া দেশের প্রায় সব জেলাতেই আর্সেনিক দূষণ লক্ষ করা যায়। প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম ও সিলেটের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম নগরে গভীর-অগভীর নলকূপ স্থাপনের কারণে মাটির ক্ষয় ও দূষণ ঘটছে।
জলাবদ্ধতার কারণে নগরীর বাসা বাড়িতে পানি ও পরিবেশ দূষণ ঘটে, কয়েকমাস আগে অনিরাপদ পানির কারণে আগ্রাবাদ, হালিশহর এলাকায় ব্যাপক ডায়রিয়া, জন্ডিসের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। অনিরাপদ ও নিম্নমানের পানি পান এবং পয়োনিষ্কাশন অব্যবস্থাপনা দেশের মানুষের কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়, ভয়ানক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। শিশুস্বাস্থ্য ও পুষ্টিতে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পড়ে। আমাদের দেশে গ্রামের টিউবওয়েলের পানিতে আর্সেনিক দূষণ মারাত্মক। নানা ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদানের কারণে মৃত্তিকায় দূষণ ঘটে। নৌ-রেলপথ টার্মিনালে এবং শহরে পর্যাপ্ত শৌচাগার গড়ে তোলা খুবই জরুরি।
শহরে গ্রামে ভাগাভাগি করে একটি শৌচাগার ব্যবহার কমানো, পরিবেশের দূষণ কমাতে পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরালো ও আধুনিক করা পরিচ্ছন্নতা পরিস্থিতির বিস্তার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও নানা কর্ম প্রতিষ্ঠানে পয়োব্যবস্থাপনা পর্যাপ্ত ও উন্নত করা এবং নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিতে ব্যাপক পরিকল্পনা নিতে হবে।