অধ্যক্ষ নজরুল স্মরণে

আবুল মোমেন

অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম একজন ব্যতিক্রমী মানুষ। পুলিশ কর্মকর্তার পুত্র, কিন্তু মজ্জাগত ছিল সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা। কলকাতায় কেটেছে ছাত্রজীবনের অনেকখানি। সেখানে তাঁর সাহিত্য বোধ যেমন লালিত হয়েছে তেমনি অর্জন করেছেন মেট্রোপলিটন মন। দেশভাগের পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ে বাংলাসাহিত্য পড়েছেন। আর সাহিত্যচর্চা শুরু করেছিলেন ছাত্রজীবনের গোড়া থেকেই।
সাহিত্যপাঠ অধ্যক্ষ নজরুলকে জীবনমুখী ও মানবতাবাদী হিসেবে গড়ে তুলেছিল। এই বোধ তিনি আজীবন লালন করে গেছেন। তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে কলকাতার প্রগতিবাদী সাহিত্য-পত্রে – নতুন সাহিত্য, পরিচয় ইত্যাদি। তাতে বোঝা যায় তাঁর ঝোঁক ছিল বামপন্থার দিকে। কিন্তু পাকিস্তানে চাকুরিজীবী পরিবারের সাহিত্যামোদী তরুণের জন্যে বামপন্থা চর্চার সুযোগ ছিল সীমিত। তরুণ নজরুল একসময় যোগ দিলেন ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে, বাংলার শিক্ষক হিসেবে।
এখানে তিনি মেধাবী কিশোরদের পেয়েছেন ছাত্র হিসেবে। তাদের মধ্যে সাহিত্য বোধের সাথে জীবনবোধ তৈরির কাজ করেছেন তিনি। তরুণদের মধ্যে মানবিক গুণাবলী এবং নান্দনিক রুচির বিকাশেও তাঁর সযত্ন প্রয়াস ছিল বরাবর।
ক্যাডেট কলেজের নিয়মবদ্ধ পরিবেশ, তদুপরি পাকিস্তানের শৃঙ্খলিত জীবনে, অধ্যক্ষ নজরুলের সাহিত্যিক প্রয়াস ধীরে ধীরে রুদ্ধ হয়ে আসে। দীর্ঘকাল, প্রায় পুরো চাকুরি জীবনের তিন দশক, তাঁর লেখালেখি তেমন দেখা যায়নি। তবে সময়টা কি ব্যর্থ গেছে? না, তাও বলা যাবে না, আশ্চর্য দক্ষতায় জনাব নজরুল ইসলাম তাঁর মৌলিক সত্তাটি রক্ষা করতে পেরেছিলেন। চাকুরি থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি তাঁর পুরোনো যোগাযোগগুলো যেন ফিরে তৈরি করতে থাকলেন।
আমরা অনেকেই অধ্যক্ষ নজরুলকে চিনেছি, সান্নিধ্যে এসেছি তাঁর অবসরগ্রহণের পরে। সেই থেকে শয্যাশায়ী হওয়ার আগে প্রায় দুই দশক তাঁকে দেখেছি, পেয়েছি কাছ থেকে। মূলত দেখা হত চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বহুদিনের এক পুরোধা ব্যক্তি ডা. কামাল এ. খানের মোমিন রোডের চেম্বারে। তখন কামালভাই ও পোর্টের প্রধান মেডিক্যাল কর্মকর্তার পদ থেকে অবসর নিয়ে একটি চেম্বারসহ নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছিলেন। তবে তিনি চেম্বারে আদৌ আগ্রহী ছিলেন কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ আছে, আদতে এটি ছিল তাঁর জনসংযোগ ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের কেন্দ্র।
অধ্যক্ষ নজরুল প্রায়ই এখানে আসতেন, কামালভাই ও নজরুলসাহেব প্রায় সমবয়সী, তাছাড়া কামালভাইয়ের সন্তান বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. ইরশাদ কামাল খান ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে তাঁর ছাত্র ছিল। ফলে পুত্রের শিক্ষক ও সমমনা সমবয়েসির সাথে কামালভাইয়ের ছিল সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের সম্পর্ক।
এখানে লক্ষ্য করেছি অধ্যাপক নজরুল ইসলামের মধ্যে একজন মুক্তমনা চিন্তাবিদের মানসটি সজীব ও সক্রিয়। দীর্ঘদিন বিভিন্ন ক্যাডেট কলেজের নিয়মবদ্ধ শৃঙ্খলায় জীবন কাটলেও তা তাঁর মুক্তচিন্তার মানসকে বদলাতে পারেনি। কেবল লেখার কাজটি বাদ দিয়েছিলেন তখন।
আমরা তাঁর মধ্যে একদিকে রসবোধ, কৌতুকবোধ যেমন দেখেছি তেমনি পাশাপাশি দেখেছি চিন্তার স্বচ্ছতা ও ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা। তাঁর চিন্তার মৌলিকত্ব এবং তা প্রকাশে অকপট দৃঢ়তা বরং অনেককে বিব্রত করেছে, কিংবা অনেককেই চমকে দিত। সমালোচক, ভিন্নমতাবলম্বীর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই তিনি দৃঢ়তার সাথে নিজের বক্তব্য তুলে ধরতে পারতেন।
অধ্যক্ষ নজরুল ইসলামের গ্রামের বাড়ি দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া অঞ্চল। এটি ধর্মীয় রক্ষণশীল এলাকা হিসেবে পরিচিত। কিন্তু নজরুল ইসলাম উদার অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ ছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের গোঁড়ামি ও সাম্প্রদায়িকতাকে তিনি পরিহার করে চলতেন। বলা যায় অধ্যক্ষ নজরুল ছিলেন উদার মানবতাবাদী একজন মানুষ।
গত বছর অক্টোবরে তাঁর এককালের ছাত্র এবং লেখক ও শিল্পবোদ্ধা আলম খোরশেদের প্রতিষ্ঠান বিস্তার : চিটাগাং আর্টস কমপ্লেক্স এবং প্রাক্তন ফৌজিয়ানদের সংগঠন মিলে তাদের প্রিয় শিক্ষকের নব্বই বছর পূর্তি উদযাপন করা হয়েছিল।
তাতে নজরুলসাহেব যোগ দিয়েছিলেন, এবং হুইল চেয়ারে বসেও তাঁর রসিকতা, কখনো বা নিজেকে নিয়ে লঘুচালে কিছু বলার মত সতেজ মনের পরিচয় পাচ্ছিলাম।
অত্যন্ত অল্প বয়সে পূর্ববঙ্গ-প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে তাঁর লেখা ছাপা হয়েছে কলকাতার সত্যযুগ, নতুন সাহিত্য এবং ঢাকার সওগাত, সমকাল ইত্যাদিতে। সে সময় তাঁর প্রবন্ধ পড়ে ‘মুগ্ধ ও অভিভুত’ হওয়ার কথা লিখেছেন বিশিষ্ট গবেষক ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক জনাব শামসুজ্জামান খান। তবে সেই ক্যাডেট কলেজ দুর্গে ১৯৬১ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত ত্রিশ বছর অতিবাহিত হওয়ায় তাঁর মত মননশীল লেখকের প্রথম বই ‘সুন্দরের সংগ্রাম ও বুদ্ধিবাদের ট্র্যাজেডি’ প্রকাশিত হয় ২০০২ সনে। তখন তাঁর বয়স ৭৬। এ বইয়ের মুখবন্ধে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখেছেন, ‘সংখ্যায় কম হলেও তাঁর রচনার মান বেশ উঁচু। তাঁর প্রবন্ধের সর্বত্র মেধা ও চিন্তার পরিচয় আছে।’
আজকে আমাদের সমাজে উদার মনের মুক্তচিন্তার বর্ষীয়ান মানুষের সংখ্যা খুবই কম। তাই এ সময়ে প্রায় ৯১ বছর বয়সেও তাঁর মত মানুষের প্রয়াণ সমাজে এমন শূন্যতা সৃষ্টি করবে যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। শয্যাশায়ী অবস্থায়ও তিনি সাম্প্রতিক বই-পুস্তকের খবর রাখতেন, অনেক তরুণ লেখকদের সাথেও যোগাযোগ রক্ষা করতেন।
সদ্য প্রয়াত অধ্যাপক মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা।