অদম্য জার্সি চট্টগ্রামের অনিকেতের

এস বি টুপসি
জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মাশরাফির সঙ্গে অনিকেত

বাংলাদেশ-জিম্বাবুয়ে সিরিজ শুরুর একদিন আগে মাশরাফি-মুশফিকদের গায়ে ওঠে আনকোরা নতুন ডিজাইনের জার্সি। আর জার্সিটি ডিজাইন করেছেন চট্টগ্রামেরই সন্তান অনিকেত ভট্টাচার্য্য। পুরো সিরিজে অনিকেতের অদম্য জার্সি গায়ে খেলবে টাইগাররা।
গত ৫ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার মোবাইল সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ‘রবি’ ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এর আয়োজনে ‘অদম্য জার্সি ডিজাইন কন্টেস্ট’ এর বিজয়ী ঘোষিত হন চট্টগ্রামের অনিকেত ভট্টাচার্য্য। এর আগে ‘অদম্য জার্সি ডিজাইন কন্টেস্ট’-এ প্রাথমিকভাবে ৮ হাজার জার্সির ডিজাইন জমা পড়ে। সেখান থেকেই সেরা ১১টি জার্সি নির্বাচন করা হয়। এরপর ভোটের মাধ্যমে সেরা নির্বাচিত হয় অনিকেত ভট্টাচার্য্যের জার্সি। সেরা ডিজাইনারের পুরস্কার হিসেবে ৫ লাখ টাকা পান অনিকেত। রাজধানী ঢাকার একটি অভিজাত হোটেলে নির্বাচিত জার্সি পরে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মাশরাফির সঙ্গে র্যাটম্পে হাঁটেন তিনি। গত রোববার টেলিফোনে কথা হয় অনিকেতের সঙ্গে।
রাউজান উপজেলার কদলপুরে জন্ম অনিকেতের। বেড়ে ওঠা নগরীর চন্দনপুরা এলাকায়। চট্টগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও তৎকালীন সরকারি চারুকলা কলেজে বিএফএ প্রি-ডিগ্রি পাশ করে ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) চারুকলা বিভাগের ভাস্কর্য বিষয়ে। চবি চারুকলা বিভাগ থেকে সফলভাবে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি। বর্তমানে জীবিকার তাগিদে থাকেন রাজধানীতে। গত ৫ বছর ধরে কাজ করছেন বাংলাদেশের প্রথম বিজ্ঞাপনী সংস’া ইন্টারস্পিড মার্কেটিং সলিউশনসে। সিনিয়র ভিজুয়ালাইজার পদে ইতোমধ্যে বেশ নামও কামিয়েছেন অনিকেত।
কলেজ জীবন থেকে জড়িত ছিলেন নাট্যচর্চার সঙ্গে। বড় ভাই অনিবার্নের হাত ধরে যোগ দেন গণায়ন নাট্য সম্প্রদায়ে। পরে ১৯৯৫ সালে যোগ দেন ফেইম স্কুল অভ ডান্স অ্যান্ড ড্রামাতে। ফেইমের সঙ্গে নাটক নিয়ে গিয়েছেন ভারতের দিল্লী, কলকাতা, মুর্শিদাবাদে। ব্যক্তিগত দিক দিয়ে এটি অনেক বড় অর্জন বলে মনে করেন তিনি।
এই তো গেল অনিকেতের প্রাথমিক পরিচয়। শিল্পচর্চার প্রেরণা পেলেন কার থেকে- প্রশ্ন করা হলে অনিকেত বলেন, ‘দাদা অনির্বাণের হাত ধরে নাট্যচর্চায় আসা। কিন’ কখনও সাহস হয়নি মঞ্চে দাঁড়াতে। সবসময় পর্দার পেছনে কাজ করতেই বেশি পছন্দ করি। ছবি আঁকার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম আগ্রহ থেকেই।’
জানা গেল, অনিকেতের মা-বাবা নাকি একদমই চাননি ছেলে চারুকলায় পড়-ক। কিন’ অমতও করেননি। সবসময় সন্তানকে প্রেরণা দিয়েছেন এগিয়ে যেতে। যখন চারুকলা বিভাগে ব্যাচ সেরা পারফরমার হলেন তখনও তার মা-বাবা সন’ষ্ট হননি। এই অসন’ষ্টিই অনিকেতকে নিয়ে এসেছে আজকের পর্যায়ে। এমনটাই বললেন তিনি।
ভাস্কর্যের ছাত্র অনিকেতের প্রাণ টানে টেরাকোটার কাজ। সব মাধ্যমে কাজ করলেও মাটিই তাকে বেশি আকর্ষণ করে। ছোটবেলায় চট্টগ্রামের দেওয়ানজী পুকুর পাড় এলাকায় কুমোরদের প্রতিমা গড়ার কাজ দেখতেন মনোযোগ দিয়ে। ছাত্রজীবনে একদিনও ক্লাস বাদ দেননি। অনিকেতের প্রিয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জারুলতলা, শহীদ মিনারও তাকে প্রেরণা দিয়েছে শৈল্পিক মনন তৈরিতে। এমনকি অদম্য জার্সি কনটেস্টের ডিজাইনের সময় কল্পনায় ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স’পতি সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদের নকশা করা শহীদ মিনারটি।
চবি’র প্রাক্তন ছাত্র অনিকেত বলেন, ‘মেটালের তৈরি শহীদ মিনারের ওপর বিদ্যমান শাপলাটির ওপর বিকেলের সূর্যের আলো হেলে পড়তো। তখন সেটি চকচক করে উঠতো। আমি কাটাপাহাড় দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় এই আলোটা দেখতাম। জার্সি ডিজাইনের সময়ও এই প্রিজম মোটিভটা রেখেছি। চবি শহীদ মিনারের স’পতি খালিদ স্যার আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। এটা ভাবতেই আমার গর্ববোধ হয়।’
অনিকেত নিজের জার্সি ডিজাইন সম্পর্কে আরও জানান, ভাস্কর্যের ছাত্র হওয়ার কারণে বিশাল জিনিস সবসময় টানে তাকে। তাই বিশাল স্মৃতিসৌধকে কীভাবে জার্সিতে আনা যায় সেই চেষ্টা ছিল। জার্সি বিচারক প্যানেলে অন্যান্যদের সঙ্গে ছিলেন ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেল, খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী মোস্তফা মনোয়ার এবং জনপ্রিয় মডেল মো. আদিল হোসেন নোবেল। অনিকেতের বিশ্বাস ছিল বিচারকরা তার ডিজাইন বুঝতে পারবেন। অনিকেত বলেন, ‘নির্বাচিত ১১টি জার্সির মধ্যে একটিতে ছিল জাতীয় সঙ্গীতের পংক্তি। এই ডিজাইনটি অনেক পছন্দ ছিল আমার। তবে, নিজের কাজের ওপরও বিশ্বাস ছিল। নির্বাচকরা আমরা ডিজাইনের বক্তব্য বুঝতে ভুল করেননি।’
জেতার পরিকল্পনা করে জার্সি প্রতিযোগিতায় নাম লেখাননি অনিকেত। অফিসের সহকর্মীর অনুপ্রেরণায় নিজের ডিজাইন জমা দেন তিনি। জমা দেয়ার পর অনেকদিন আয়োজকদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না। ভাবলেন, হয়ত নির্বাচিত হননি তিনি। হুট করে একদিন আয়োজক কর্তৃপক্ষ ফোনে জানালেন, ১১টি জার্সি ডিজাইনের মধ্যে তার জার্সিটি নির্বাচিত হয়েছে। কেমন ছিল চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার দিনটি জানতে চাইলে অনিকেত হেসে বললেন, ‘৫ নভেম্বর গালা ইভেন্টের আগে আমাদের পুরো অনুষ্ঠানের রিহার্সাল করানো হয়। আমি বরাবরই পর্দার পেছনের মানুষ। র্যা ম্প ওয়াকের সময় অন্যদের ঠেলে ঠেলে পাঠাতাম। একবার হাঁটার পর অবশ্য কনফিডেন্ট হয়ে গিয়েছিলাম কারণ আমি জানতাম কীভাবে আমি এ পর্যায়ে পৌঁছেছি।’
সেরা ৫ জার্সির মধ্যে যখন তার নাম ঘোষিত হলো তখন কি হলো? জানা যায়, স্টেজে ঘোষণার আগে অধিনায়ক মাশরাফিই অনিকেতকে জানান তিনিই বিজয়ী কারণ স্টেজে বিজয়ীর নাম ঘোষণার আগে মাশরাফি তার ডিজাইনের জার্সি পরে ব্যাকস্টেজে চলে আসেন। তিনি যখন অনিকেতকে অভিনন্দন জানালেন, কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে পড়েন তিনি। অনিকেত বলেন, ‘তখন কিছুই মাথায় ঢুকছিল না। কিছুই শুনতে পাচ্ছিলাম না। পরে আমার নাম ঘোষণার পর স্টেজে সব ক্রিকেটাররা আমার ডিজাইনের জার্সি পরে স্টেজে দাঁড়ালেন। র্যাাম্পে হাঁটলাম অধিনায়ক মাশরাফির সঙ্গে। অনুষ্ঠানের একদম শেষে ধন্যবাদ জানাই তাকে। মাশরাফির আন্তরিকতা মু করে আমাকে।’
অনিকেত হেসে বলেন, ‘ফাইনাল ফটোসেশনে আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ক্রিকেটার আল-আমিন। তিনি আমার দেশের বাড়ি কোথায় জানতে চান। আমি চট্টগ্রামের বলায় তিনি অবাক হন।’
দিনশেষে অনিকেতের কাছে এই প্রাপ্তির সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি তার বাবা-মায়ের আনন্দ। বিজয়ী হওয়ার পর সবাইকে চমকে দিয়ে একদিনের জন্য চট্টগ্রামে আসেন তিনি। সেদিন তার স্ত্রী, মা-বাবার উচ্ছ্বাস ছিল অন্যরকম। অনিকেতের বাবা-মা তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন। অনিকেত বলেন, ‘এই প্রাপ্তিতেই আমার অভিভাবক সন’ষ্ট । তাদের খুশি কোনো টাকার অংকে পরিমাপ করা যায় না।’
নিজের শিল্পের এতবড় স্বীকৃতি পাওয়ার পর অনিকেতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিজের চর্চা চালিয়ে যাওয়া। তার ইচ্ছা নিজের তৈরি ভাস্কর্যের একক প্রদর্শনীর। অনিকেতের ভাষ্যে, শিখতে হবে অবিরত। আগ্রহকে মরতে দেয়া যাবে না কখনও। এমন দৃপ্ত প্রত্যয়ই হয়তো অনিকেতকে এগিয়ে নিয়ে যাবে বহুদূর।

আপনার মন্তব্য লিখুন