অগ্রনি’ত অভিভাষণ ধারাবাহী

প্রৌঢ় বয়সে একদা যখন এই বিদ্যায়তনের প্রতিষ্ঠা করেছিলাম তখন আমার সম্মুখে ভাসছিল ভবিষ্যৎ, পথ তখন লক্ষ্যের অভিমুখে, অনাগতের আহ্বান তখন ধ্বনিত- তার ভাবরূপ তখনও অস্পষ্ট, অথচ একদিক দিয়ে তা এখনকার চেয়ে অধিকতর পরিস্ফুট ছিল কারণ তখন যে- আদর্শ মনে ছিল তা বাস্তবের অভিমুখে আপন অখণ্ড আনন্দ নিয়ে অগ্রসর হয়েছিল। আজ আমার আয়ুষ্কাল শেষপ্রায়, পথের অন্ত প্রান্তে পৌছিয়ে পথের আরম্ভ-সীমা দেখবার সুযোগ হয়েছে, আমি সেই দিকে গিয়েছি, যেমনতর সূর্য্য যখন পশ্চিম অভিমুখে অস্তাচলের তটদেশে তখন তার সামনে থাকে উদয়দিগন্ত, যেখানে তার প্রথম যাত্রারম্ভ।
অতীতকাল সম্বন্ধে আমরা যখন বলি তখন আমাদের হৃদয়ের পূর্ব্বরাগ অত্যুক্তি করে, এমন বিশ্বাস লোকের আছে। এর মধ্যে কিছু সত্য আছে, কিন’ সম্পূর্ণ সত্য নেই। যে দুরবর্ত্তী কালের কথা আমরা স্মরণ করি তার থেকে যা কিছু অবান্তর তা তখন স্বতই মন থেকে ঝরে পড়েছে। বর্ত্তমান কালের সঙ্গে যত কিছু আকস্মিক যা কিছু অসঙ্গত সংযুক্ত থাকে তা তখন স্খলিত হয়ে ধুলিবিহীন; পূর্ব্বে নানা কারণে যার রূপ ছিল বাধাগ্রস্ত তার সেই বাধার কঠোরতা আজ আর পীড়া দেয় না। এই জন্য গতকালের যে-চিত্র মনের মধ্যে প্রকাশ পায় তা সুসম্পূর্ণ, যাত্রারম্ভের সমস্ত উৎসাহ স্মৃতিপটে তখন ঘনীভূত। তার মধ্যে এমন অংশ থাকে না যা প্রতিবাদরূপে অন্য অংশকে খণ্ডিত করতে থাকে। এই জন্যই অতীত স্মৃতিকে আমরা নিবিড়ভাবে মনে অনুভব ক’রে থাকি। কালের দূরত্বে, যা যথার্থ সত্য তার বাহ্যরূপের অসম্পূর্ণতা ঘুচে যায়, সাধনার কল্পমুর্ত্তি অক্ষুণ্ন হয়ে দেখা দেয়।
প্রথম যখন এই বিদ্যালয় আরম্ভ হয়েছিল থকন এর আয়োজন কত সামান্য ছিল, সেকালে এখানে যারা ছাত্র ছিল তারা তা জানে। আজকের তুলনায় তার উপকরণ-বিরলতা, সকল বিভাগেই তার অকিঞ্চনতা অত্যন্ত বেশি ছিল। ক’টি বালক ও দুই-এক জন অধ্যাপক নিয়ে বড় জামগাছতলায় আমাদের কাজের সূচনা করেছি। একান্তই সহজ ছিল তাদের জীবনযাত্রা-এখনকার সঙ্গে তার প্রভেদ গুরুতর। এ কথা বলা অবশ্যই ঠিক নয় যে এই প্রকাশের ক্ষীণতাতেই সত্যের পূর্ণতর পরিচয়। শিশুর মধ্যে আমরা যে রূপ দেখি তার সৌন্দর্য্যে আমদের মনে আনন্দ জাগায় কিন’ তার মধ্যে প্রাণরূপের বৈচিত্র্য ও বহুধাশক্তি নেই। তার পূর্ণ মূল্য ভাবী-কালের প্রত্যাশার মধ্যে। তেমনি আশ্রমের জীবনযাত্রার যে প্রথম উপক্রম, বর্ত্তমানে সে ছিল ছোট, ভবিষ্যতেই সে ছিল বড়। তখন যা ইচ্ছা করেছিলাম তার মধ্যে কোনো সংশয় ছিল না। তখন আশা ছিল অমৃতের অভিমুখে, যে-সংসার উপকরণ-বহুতলায় প্রতিষ্ঠিত তা পিছনে রেখেই সকলে এসেছিলেন। যাঁরা এখানে আমার কর্ম্মসঙ্গী ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র ছিলেন তাঁরা। আজ মনে পড়ে, কী কষ্টই না তাঁরা এখানে পেয়েছেন, দৈহিক সাংসারিক কত দীনতাই না তাঁরা বহন করেছেন। প্রলোভনের বিষয় এখানে কিছুই ছিল না, জীবনযাত্রার সুবিধা তো নয়ই, এমন কি খ্যাতিরও না, অবস’ার ভাবী উন্নতির আশা মরীচিকারূপেও তখন দূরদিগন্তে ইন্দ্রজাল বিস্তার করেনি। কেউ তখন আমাদের কথা জানত না, জানাতে ইচ্ছাও করিনি; এখন যেমন সংবাদপত্রের নানা ছোটবড় জয়ঢাক আছে যা সামান্য ঘটনাকে শব্দায়িত ক’রে রটনা করে তার আয়োজনও তখন এমন ব্যাপক ছিল না। এই বিদ্যালয়ের কথা ঘোষণা করতে অনেক বন্ধু ইচ্ছাও করেছেন, কিন’ আমরা তা চাই নি। লোকচক্ষুর অগোচরে, বহু দুঃখের ভিতর দিয়ে সে ছিল আমাদের যথার্থ তপস্যা। অর্থের এত অভাব ছিল যে আজ জগদ্ব্যাপী দুঃসময়েও তা কল্পনা করা যায় না। আর সে কথা কোনোকালে কেউ জানবেও না, কোনো ইতিহাসে তা লিখিত হবে না। আশ্রমের কোনো সম্পত্তি ছিল না সহায়তা ছিল না- চাইও নি। এই জন্যই, যাঁরা তখন এখানে কাজ করেছেন তাঁরা অন্তরে দান করেছেন, বাইরে কিচু নেন নি। যে আদর্শে আক্বষ্ট হয়ে এখানে এসেছি তার বোধ সকলেরই মনে যে স্পষ্ট বা প্রবল ছিল তা নয় কিন’ অল্প পরিসরের মধ্যে তা নিবিড় হ’তে পেরেছিল। ছাত্রেরা তখন আমাদের অত্যন্ত নিকটে ছিল-অধ্যাপকেরাও পরস্পর অত্যন্ত নিকটে ছিলেন, পরস্পরের সুহৃৎ ছিলেন তাঁরা। আমাদের দেশের তপোরবনের আদর্শ আমি নিয়েছিলাম। কালের পরিবর্ত্তনের সঙ্গে সে আদর্শের রূপের পরিবর্ত্তন হয়েছে, কিন’ তার মূল সত্যটি ঠিক আছে-সেটি হচ্ছে, জীবিকার আদর্শকে স্বীকার ক’রে তাকে সাধনার আদর্শের অনুগত করা। এক সময়ে এটা অনেকটা সুসাধ্য হয়েছিল, যখন জীবনযাত্রার পরিধি ছিল অনতিবৃহৎ। তাই বলেই সেই স্বল্পায়তনের মধ্যে সহজ জীবনযাত্রাই শ্রেষ্ঠ আদর্শ একথা সম্পূর্ণ সত্য নয়। উচ্চতর সঙ্গীতে নানা ত্রুটি ঘটতে পারে, একতারায় ভুলচুকের সম্ভাবনা কম, তাই ব’লে একতারাই শ্রেষ্ঠ এমন নয়। বরঞ্চ কর্ম্ম যখন বহুবিস্তৃত হয়ে বন্ধুর পথে চলতে থাকে তখন তার সকল ভ্রমপ্রমাদ সত্ত্বেও যদি তার মধ্যে প্রাণ থাকে তবে তাকেই শ্রদ্ধা করতে হবে। শিশু অবস’ার সহজতাকে চিরকাল বেঁধে রাখবার ইচ্ছা চেষ্টার মতো বিড়ম্বনা আর কী আছে? আমাদের কর্ম্মের মধ্যেও সেই কথা। যখন একলা ছোট কার্য্যক্ষেত্রের মধ্যে ছিলুম তখন সব কর্ম্মীদের মনে এক অভিপ্রায়ের প্রেরণা সহজেই কাজ করত। ক্রমে ক্রমে যখন এ আশ্রম বড় হয়ে উঠল তখন এক জনের অভিপ্রায় এর মধ্যে সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ পাবে এ সম্ভব হ’তে পারে না।-অনেকে এখানে এসেছেন, বিচিত্র তাঁদের শিক্ষাদীক্ষা-সকলকে নিয়েই আমি কাজ করি, কাউকে বাছাই করি নে বাদ দিই নে, নানা ভুলত্রুটি ঘটে নানা বিদ্রোহ-বিরোধ ঘটে-এ সব নিয়েই জটিল সংসারে জীবনের যে-প্রকাশ ঘাতাভিঘাতে সর্ব্বদা আন্দোলিত তাকে আমি সম্মান করি। আমার প্রেরিত আদর্শ নিয়ে সকলে মিলে একতারাযন্ত্রে গুঞ্জরিত করবেন এমন অতি সরল ব্যবস’াকে আমি নিজেই শ্রদ্ধা করি নে। আমি যাকে বড় ব’লে জানি, শ্রেষ্ঠ ব’লে যা বরণ করেছি অনেকের মধ্যে তার প্রতি নিষ্ঠার অভাব আছে জানি, কিন’ তা নিয়ে নালিশ করতে চাই নে। আজ আমি বর্ত্তমান থাকা সত্বেও এখানকার যা কর্ম্ম তা নানা বিরোধ ও অসঙ্গতির মধ্য দিয়ে প্রাণের নিয়মে আপনি তৈরি হয়ে উঠছে; আমি যখন থাকব না, তখনও অনেক চিত্তের সমবেত উদ্যোগে যা উদ্ভাবিত হ’তে থাকবে তাই হবে সহজ সত্য। কৃত্রিম হবে যদি কোনো এক ব্যক্তি নিজের আদেশ-নির্দ্দেশে একে বাধ্য ক’রে চালায়-প্রাণধর্ম্মের মধ্যে স্বতোবিরোধীতাকেও স্বীকার ক’রে নিতে হয়।
অনেক দিন পরে আজ এ আশ্রমকে সমগ্র ক’রে দেখতে পাচ্ছি; দেখছি, আপন নিয়মে এ আপনি গড়ে উঠেছে। গঙ্গা যখন গঙ্গোত্রীর মুখে তখন একটিমাত্র তার ধারা। তার পর ক্রমে বহু নদনদীর সহিত যতই সে সঙ্গত হ’ল, সমুদ্রের যত নিকটবর্ত্তী হ’ল, কত তার রূপান্তর ঘটেছে। সেই আদিম স্বচ্ছতা আর তার নেই, কত আবিলতা প্রবেশ করেছে তার মধ্যে, তবু কেউ বলে না গঙ্গার উচিত ফিরে যাওয়া, যেহেতু অনেক মলিনতা ঢুকেছে তার মধ্যে, সে সরল গতি আর তার নেই। সব নিয়ে যে সমগ্রতা সেইটিই বড়-আশ্রমও স্বতোধাবিত হয়ে সেই পথেই চলেছে, অনেক মানুষের চিত্তসম্মিলনে আপনি গড়ে উঠছে। অবশ্য এর মধ্যে একটা ঐক্য এনে দেয় মূলগত একটা আদিম বেগ; তারও প্রয়োজন আছে, অথচ এর গতি প্রবল হয় সকলের সম্মিলনে। নিত্যকালের মতো কিছুই কল্পনা করা চলে না-তবে এর মূলগত একটি গভীর তত্ত্ব বরাবর থাকবে একথা আমি আশা করি-সে-কথা এই যে এটা বিদ্যাশিক্ষার একটা খাঁচা হবে না, এখানে সকলে মিলে একটি প্রাণলোক সৃষ্টি করবে। এমনতরো স্বর্গলোক কেউ রচনা করতে পারে না যার মধ্যে কোনো কলুষ নেই দুঃখজনক কিছু নেই-কিন’ বন্ধুরা জানবেন যে এর মধ্যে যা নিন্দনীয় সেইটাই বড় নয়। চোখের পাতা ওঠে, চোখের পাতা পড়ে; কিন’ পড়াটাই বড় নয়, সেটাকে বড় বললে অন্ধতাকে বড় বলতে হয়। যাঁরা প্রতিকূল, নিন্দার বিষয় তাঁরা পাবেন না এমন নয়-নিন্দনীয়তার হাত থেকে কেউই রক্ষা পেতে পারে না। কিন’ তাকে পরাস্ত ক’রে উত্তীর্ণ হয়েও টিকে থাকাতেই প্রাণের প্রমাণ। আমাদের দেহের মধ্যে নানা শত্রু নানা রোগের জীবাণু-তাকে আলাদা ক’রে যদি দেখি তো দেখব প্রত্যেক মানুষ বিকৃতির আলয়। কিন’ আসলে রোগকে পরান্ত ক’রে যে স্বাস’্যকে দেখা যাচ্ছে সেইটেই সত্য। দেহের মধ্যে যেমন লড়াই চলছে প্রত্যেক অনুষ্ঠানের মধ্যেই তেমনি ভালমন্দের একটা দ্বন্দ্ব ্হাছে-কিন’ সেটা পিছন দিকের কথা। এর মধ্যে স্বাসে’্যর তত্ত্বটাই বড়।
আমি এমন কথা কখনও বলি নি আজও বলি নে যে আমি যে-কথা বলব তাই বেদবাক্য-সে রকম অধিনেতা আমি নই। অসাধারণ তত্ত্ব তো আমি কিছু উদ্ভাবন করি নি; সাধকেরা যে অখণ্ড পরিপূর্ণ জীবনের কথা বলেন সে-কথা যেন সকলে স্বীকার করে নেন। এই একটি কথা ধ্রুব হয়ে থাক। তার পরে পরিবর্ত্তমান পরিবর্দ্ধমান সৃষ্টির কাজ সকলে মিলেই হবে। মানুষের দেহে যেমন অসি’, এই অনুষ্ঠানের মধ্যেও তেমনি একটি যান্ত্রিক দিক আছে। এই অনুষ্ঠানের মধ্যেও তেমনি একটি যান্ত্রিক দিক আছে। এই অনুষ্ঠান যেন প্রাণবান হয় কিন’ যন্ত্রই যেন মুখ্য না হয়ে ওঠে, হৃদয় প্রাণ কল্পনায় সঞ্চরণের পথ যেন থাকে। আমি কল্পনা করি, এখানকার বিদ্যালয়ের আস্বাদন এক সময়ে যারা পেয়েছেন, এখানকার প্রাণের সঙ্গে প্রাণকে মিলিয়েছেন-অনেক সময় হয়তো তাঁরা এখানে পরিপ্রেক্ষিতে দেখতে পান এখানে যা বড় যা সত্য। আমার বিশ্বাস সেই দৃষ্টিবান অনেক ছাত্র ও কর্ম্মী নিশ্চয়ই আছেন, নইলে অস্বাভাবিক হ’ত। এক সময়ে তাঁরা এখানে নানা আনন্দ পেয়েছেন, সখ্যবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন, এর প্রতি তাঁদের মমতা থাকবে না এ হ’তেই পারে না। আমি আশা করি, কেবল নিষ্ক্রিয় মমতা দ্বারা নয় এই অনুষ্ঠানের অন্তর্ব্বর্ত্তী হয়ে যদি তাঁরা এর শুভ ইচ্ছা করেন তবে এর প্রাণের ধারা অব্যাহত থাকতে পারবে, যন্ত্রের কঠিনতা বড় হয়ে উঠতে পারবে না। এক সময়ে এখানে যাঁরা ছাত্র ছিলেন, যাঁরা এখানে কিচু পেয়েছেন কিছু দিয়েছেন, তাঁরা যদি অন্তরের সঙ্গে একে গ্রহণ করেন তবেই এ প্রাণবান হবে। এই জন্য আজ আমার এই ইচ্ছা প্রকাশ করি যে যাঁরা জীবনের অর্ঘ্য এখানে দিতে চান যাঁরা মমতা দ্বারা একে গ্রহণ করতে চান তাঁদের অন্তর্ব্বর্ত্তী ক’রে নেওয়া যাতে সহজ হয় সেই প্রণালী যেন আমরা অবলম্বন করি। যাঁরা একদা এখানে ছিলেন তাঁরা সম্মিলিত হয়ে এই বিদ্যালয়কে পূর্ণ ক’রে রাখুন এই আমার অনুরোধ। অন্য সব বিদ্যালয়ের মতো এ আশ্রম যে কলের জিনিষ না হয়-তা করব না বলেই এখানে এসেছিলাম। যন্ত্রের অংশ এসে পড়েছে কিন’ সবার উপরে প্রাণ যেন সত্য হয়। সেই জন্যই আহ্বান করি তাঁদের যাঁরা এক সময়ে এখানে ছিলেন, যাঁদের মনে এখনও সেই স্মৃতি উজ্জ্বল হয়ে আছে। ভবিষ্যতে যদি আদর্শের প্রবলতা ক্ষীণ হয়ে আসে তবে সেই পূর্ব্বতনেরা যেন একে প্রাণধারায় সঞ্জীবিত ক’রে রাখেন, নিষ্ঠাদ্বারা শ্রদ্ধাদ্বারা এর কর্ম্মকে সফল করেন-এই আশ্বাস পেলেই আমি নিশ্চিন্তে হয়ে যেতে পারি।
৮ই পৌষ (১৩৪১ সন) বিশ্বভারতী পরিষদের বার্ষিক অধিবেশনে আচার্য্যের অভিভাষণ।
শ্রীযুক্ত পুলিনবিহারী সেন কর্ত্তৃক অনুলিখিত ও তদনন্তর বিশ্বকবি কর্ত্তৃক সংশোধিত ও অনুমোদিত।
(প্রবাসী, ফাল্গুন ১৩৪১ থেকে সংগৃহীত)