অগ্নিকাণ্ড নাকি নাশকতা?

মোহাম্মদ রফিক

নগরের চাক্তাই ভেড়া মার্কেট বস্তিতে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডে শিশুসহ ৯ জনের প্রাণহানি সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে বড় ঘটনা। দমকল বাহিনী বলছে, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত। আগুন লাগার কারণ অনুসন্ধান করতে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ইলিয়াস হোসেন চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছেন। রোববার সকালে ঘটনাস’লে গিয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, ভেড়া মার্কেট এলাকার বস্তির জায়গাটি সরকারি। খাস জায়গা হওয়ায় এটি দখলে রাখতে দুটি গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে বিরোধে লিপ্ত থাকার তথ্য রয়েছে। তবে কি কারণে এতবড় অগ্নিকাণ্ড- তা দেখবে তদন্ত কমিটি।’
ক্ষতিগ্রস্তরা বলছেন, এটি দুর্ঘটনা নয়, পরিকল্পিত নাশকতা। বস্তির বাসিন্দা সুফিয়া বেগম জানান, শনিবার দিবাগত আড়াইটার দিকে মুখোশপরা চার-পাঁচজন যুবক বস্তিতে আসেন। তাদেরকে বস্তির চারপাশে ‘পাউডার’ জাতীয় কিছু ছিটাতে তারা দেখেছেন। ‘পাউডার’ ছিটানোর পর বস্তির প্রবেশ মুখে রহিমা বেগমের (অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছেন) ঘরের সামনে অবস’ান নেয়। রাত সাড়ে তিনটার দিকে তালি বাজিয়ে তারা দ্রুত বস্তি এলাকা ত্যাগ করে। এরপর মুহূর্তের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে।
ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, কিছুদিন আগে জেলা প্রশাসনের লোকজন বস্তি থেকে তাদের সরে যেতে বলেন। কিন’ তারা চলে যেতে চাইলে বাধা দেন দখলদাররা। তাদের অভিযোগ, দখলদারদের মধ্যে একটি পক্ষ উচ্ছেদের পক্ষে। আরেক পক্ষ চায় নানা কৌশলে সরকারি খাস জায়গাটি দখলে রাখতে। কেউ কেউ উচ্ছেদ বন্ধে উচ্চ আদালতে যাওয়ার কথা বলে নিম্ন আয়ের এ লোকদের বস্তিতে থাকতে বাধ্য করেন। ইতোমধ্যে বস্তি ছেড়ে চলেও গেছেন অনেকে। জেলা প্রশাসন জানায়, পুড়ে যাওয়া বস্তিগুলো উচ্ছেদ কার্যক্রমের তৃতীয় পর্যায়ে অর্ন্তভুক্ত ছিল। বস্তি খালি করার জন্য ইতোমধ্যে ভাড়াটিয়া ও দখলদারদের কাছেও তথ্য পাঠানো হয়েছিল।
জানা গেছে, কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী মেরিন ড্রাইভ রোডের উত্তরে রাজাখালী খালের চর দখল করে ২০০০ সালে গড়ে তোলা হয়েছিল নতুন বস্তি। বস্তির বাসিন্দা আলতাফ হোসেনের অভিযোগ, ২০০০ সালে মো. আকতার নামে বক্সিরহাট ওয়ার্ড যুবলীগের এক নেতা ও আবদুল করিমসহ শতাধিক ব্যাক্তি মিলে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এ সিন্ডিকেট সরকারি খাস জমিটি দখল করে পরস্পর ভাগবাটোয়ারা করে নেন। পরে সেখানে বস্তি গড়ে তুলে ভাড়া দেন। সাত্তার, মোরশেদ, হেলাল, ফরিদ, বেলালসহ স’ানীয় কিছু যুবককে ভাড়া আদায়ের দায়িত্ব দেন আকতার ও করিম। বস্তিতে ঘরপ্রতি ভাড়া দেড় হাজার থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হতো। বস্তিতে বিদ্যুতের কিছু সংযোগ ছিল বৈধ আর কিছু অবৈধ। ছিল না গ্যাস সংযোগ। ভাড়াটিয়ারা সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করতেন।
বস্তির বাসিন্দা আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘কিছুদিন আগে প্রশাসনের লোক এসে আমাদের চলে যেতে বলেন। আমরা চলে যেতে চাইলে ফরিদ সওদাগর, মোরশেদ ও বেলাল এসে নিষেধ করেন। এ কারণে যেতে পারিনি।’
অগ্নিকাণ্ডে নিহত রহিমা বেগমের স্বামী সুরুজ মিয়া বলেন, ‘১২-১৩ দিন আগে জেলা প্রশাসনের লোক আমাদের চলে যেতে বলেছিলেন। কিন’ ‘জমিদার’ ফরিদ সওদাগর এসে বলেন-তিনি হাইকোর্টে মামলা করবেন। উচ্ছেদ বন্ধ হয়ে যাবে।’ অভিযোগ, আগুনে পুড়ে যাওয়া বস্তির পাশে যুবলীগ নেতা আকতারের আরো একটি বস্তি আছে। কর্ণফুলী নদীর চরের জায়গা দখল করে আকতার সেখানে বস্তি গড়ে তুলেছেন। বক্তব্য জানতে যুবলীগ নেতা আকতারের মোবাইলে গতকাল রোববার একাধিকবার কল করলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।